জাতীয়

হস্তক্ষেপ করা না হলে করোনাভাইরাসে বাংলাদেশে ৫০৭,৪৪২ লোক মারা যেতে পারে


ব্র্যাক, নর্থ সাউথ, এবং জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য গবেষকদের একটি দল অনুমান করেছেন যে, বাংলাদেশে করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্যে যদি এখনই কোন পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে এই রোগ  দুর্বল হয়ে পড়ার আগেই দেশটিতে ৫০৭,৪৪২ জন মানুষ মারা যেতে পারে। 

‘কোভিড-১৯: কেসেস, হসপিটালাইজেশান নিড, ক্রিটিক্যাল কেয়ার নিড অ্যাণ্ড মর্টালিটি প্রজেকশান্স ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক সংক্ষিপ্ত রিপোর্টে মলয় কে মৃধা, দিপক কে মিত্র, অ্যালেইন ল্যাবরিক, ইফান ঝু, রিনা রানি পাল বলেছেন যে, মহামারীর শেষ নাগাদ বাংলাদেশের ১৬৪ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে ৮৯,১২০,১৬১ জনের এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে; ৩,০৩৭,৩৯৩ জনকে হাসপাতালে নেয়ার প্রয়োজন পড়বে; ৬৯৬,৫৯৫ জনকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ক্রিটিক্যাল কেয়ার দেয়া লাগতে পারে এবং ৫০৭,৪৪২ জন এই রোগে মারা যেতে পারে। 

তারা দেখেছেন যে, ৩.৪ শতাংশ আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেয়ার দরকার পড়বে, হাসপাতালে ভর্তিকৃতদের মধ্যে ২২.৯ শতাংশকে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থাসহ ক্রিটিক্যাল কেয়ার দেয়ার প্রয়োজন পড়বে, এবং সকল আক্রান্তের (যাদের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে এবং যাদের পায়নি) মধ্যে ০.৩৮% এবং লক্ষণ প্রকাশিতদের মধ্যে ০.৫৭% মারা যাবে। 

লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজের কোভিড-১৯ রেসপন্স টিম যে গবেষণা প্রকাশ করেছে, সেটিতে ব্যবহৃত মডেলই মূলত এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে যে ধারণাগুলো অনুসরণ করা হয়েছে, সেগুলো হলো: (১) ভাইরাসের ইনকিউবিশান সময়কাল হলো ৫.১ দিন; (২) ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ৪.৬ দিন পর এর আক্রান্তের লক্ষণ প্রকাশ হতে শুরু করে; (৩) ভাইরাস সংক্রমনের সময়কাল হলো ৬.৫ দিন; (৪) ৬৭% আক্রান্তের ক্ষেত্রে লক্ষণ প্রকাশিত হয়; (৫) লক্ষণ প্রকাশ থেকে হাসপাতালে নেয়ার মধ্যবর্তী সময় হলো ৫ দিন; (৬) ক্রিটিক্যাল কেয়ার ছাড়াই হাসপাতালে অবস্থানের গড় সময়কাল হলো ৮ দিন; (৭) ক্রিটিক্যাল কেয়ারের সময়কালসহ হাসপাতালে অবস্থানের গড় সময়কাল হলো ১০.৪ দিন; (৮) মোট জনসংখ্যার মধ্যে আক্রান্তের অনুপাত হলো ৮১%। 

২০২০ সালের ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ কে আন্তর্জাতিকভাবে মহামারী হিসেবে ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশে ৮ মার্চ কোভিড-১৯এ আক্রান্ত তিনজনকে সনাক্ত করা হয়। ১৯ মার্চ নাগাদ ১৭ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজন মারা গেছে এবং তিনজন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। 

বাংলাদেশে এই মহামারী শুরু হয়েছে ২ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিকভাবে প্রথম ব্যক্তির প্রবেশের ভেতর দিয়ে। কোভিড-১৯ এ প্রথম ব্যক্তি যখন মারা গেলো, তখন দেশে এই লক্ষণে আক্রান্তের সংখ্যা ১,৬৮৫ জনে গিয়ে পৌঁছেছে। 

যে মডেল এখানে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটির ইঙ্গিত অনুযায়ী ৩১ মার্চ নাগাদ এ লক্ষণ দেখা যাবে ২১,৪৬১ জনের মধ্যে। এই সময়ের মধ্যে ২৭৫ জনকে হাসপাতালে নেয়ার প্রয়োজন হবে, ১৩ জনকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার দিতে হবে এবং সর্বমোট ছয়জনের মৃত্যু হতে পারে।

যদি এটা প্রশমন বা দমনের জন্য কোন পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে ২০২০ সালের ৮ মে পর্যন্ত মানুষ আক্রান্ত হতে থাকবে। 

রিপোর্টে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ খারাপ পরিস্থিতিতে, সর্বমোট ৮৯,১২০,১৬১ জন ব্যক্তি এই রোগের লক্ষণে আক্রান্ত হতে পারে, ৩,০৩৭,৩৯৩ জনকে হাসপাতালে নেয়ার দরকার হতে পারে, ৬৯৬,৫৯৫ জনকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ক্রিটিক্যাল কেয়ার দেয়া লাগবে এবং মহামারী যতদিনে দুর্বল হয়ে আসবে, ততদিনে ৫০৭,৪৪২ জন মানুষ মারা যেতে পারে। 

সীমাবদ্ধতা

তবে কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে যে, এই রিপোর্টে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, বাস্তবতা রিপোর্টের অনুমানের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। 

তারা বলেছেন, “আমরা একটা কৃত্রিম শুরুর দিন থেকে হিসেব করছি। ১৮ মার্চ একজন মারা যাওয়ার দিনটি থেকে এটার হিসাব করা হচ্ছে। ২০২০ সালের ১৮ মার্চ যে মৃত্যুর ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে, আসল মৃত্যুর সংখ্যা তার চেয়ে বেশি হতে পারে। জনসংখ্যার বয়সের যে কাঠামো, সেটা নেয়া হয়েছে ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য থেকে, কিন্তু আমরা মনে করি রিপোর্টে বয়স্ক জনগোষ্ঠির যে সংখ্যা দেখানো হয়েছে, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে বেশি। কোভিড-১৯ রোগে মৃত্যুর হার বয়স্কদের মধ্যে যেহেতু বেশি, সে কারণে এখানে যে অনুপাতের কথা বলা হচ্ছে, প্রকৃত আক্রান্ত-মৃত্যুর হার তার চেয়ে বেশি হতে পারে”।

লেখকরা আরও বলেছেন, “আমাদের ফলাফলকে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে তুলনা করার মতো যথেষ্ট তথ্য আমাদের ছিল না – যেমন, জনসংখ্যার ঘনত্ব, তাপমাত্রা এবং জনগণের চলাফেরার তথ্য ছিল না। তথ্যের ঘাটতির কারণে আমরা এটাও অনুমান করেছি যে, সময়ের সাথে সাথে সকল বয়সের ব্যক্তিরাও একই হারে আক্রান্ত হতে থাকবে”।

লেখকরা বলেছেন যে, এই রিপোর্টের উদ্দেশ্য হলো সরকারকে একটা ধারণা দেয়া যে কোভিড-১৯ প্রশমন বা তত্ত্বাবধান করা প্রয়োজন। এই হস্তক্ষেপের পদক্ষেপগুলো কি হবে, সেটার পরিকল্পনা করা উচিত বাংলাদেশের। রিপোর্টের প্রাপ্ত ফল অনুযায়ী, বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকরা দেশের স্বাস্থ্য সেবা সিস্টেমের ভবিষ্যৎ চাহিদা সম্পর্কে একটা ধারণা করতে পারবেন। বাস্তবতা হলো কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগিদের গড়ে ১০.৪ দিন পর্যন্ত হাসপাতালে অবস্থান করতে হয়। এর অর্থ হলো দেশের আরও বহু বেডের ব্যবস্থা করতে হবে। সময়টা এখানে মূল্যবান, কারণ যে শূণ্যতাটা পূরণ করতে হবে, সেটা বিশাল।

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments