শিল্প ও সাহিত্য

পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা 


সি নিউজ ডেস্ক : বাঙালি জাতির অন্যতম ঐতিহ্য মৃৎশিল্প। এই শিল্পের চাহিদা বছরের অন্য সময়ে না থাকলেও পহেলা বৈশাখে মাটির তৈরি জিনিসপত্র ছাড়া যেন চলেই না। এই দৃশ্য চোখে পড়ে, পহেলা বৈশাখের বিভিন্ন মেলায়।

রাজধানীর চারুকলার ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ  রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে মাটির তৈরি যে সমস্ত শিল্পকর্ম দেখা যায়, তা মূলত তৈরি হয় ঢাকার বাইরে। বিশেষ করে, সাভার, ধামরাই, মাদারীপুর, শরীয়তপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় দৃষ্টিনন্দন এই শিল্প বাঙালির হৃদয়  চৈতন্ন্যকে ভিন্নভাবে আন্দোলিত করে। 

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সাভার ও ধামরাইয়ের পালপাড়াগুলোতে বেড়েছে ব্যস্ততা। মাটির তৈরি পশু-পাখি ও জীবজন্তুসহ নানা তৈজসপত্র তৈরিতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন মৃৎশিল্পীরা।

তবে, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের কারণে মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প বাঁচাতে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার দাবি বিশেষজ্ঞদের।  

নলাম কুমারপাড়ার সুচিন্দ্র পাল, নিপুন হাতে ফুটিয়ে তুলছেন কুমিরের অবয়ব। বৈশাখে বাড়তি উপার্জনের আশায়, দিন-রাত পরিশ্রম করে, মাটির তৈরি জীবজন্তু ও পশুপাখি তৈরি করছেন তিনি। একই চিত্র সাভার ও ধামরাইয়ের শিমুলিয়া, হাজীপাড়া, বানিয়াপাড়া ও কাঁকড়াসহ বিভিন্ন পালপাড়ার।

বাংলা নতুন বছর উপলক্ষে মাটির তৈরি নানা সৌখিন উপকরণ তৈরিতে ব্যস্ততা বেড়েছে মৃৎশিল্পীদের। তবে, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের কারণে মাটির তৈজসপত্রের চাহিদা কমে যাওয়ায়, বছরের অন্য সময় অনেকটাই নিরুত্তাপ থাকে কুমারপাড়াগুলো।

বৈশাখের বাজার ধরতে মাটির তৈরি পণ্যগুলো বুঝে নিতে, ঘাটে নৌকা ভিড়িয়েছেন পাইকাররা। ক্রেতার চাহিদা মোতাবেক পণ্য পেলে বাড়তি লাভের আশা তাদের। তারা বলেন, যে পরিমাণ টাকা খরচ হয় সে অনুযায়ী দাম পাওয়া যায় না। সিলভার মার্কেটে আসার পর থেকে মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা কমে গেছে। 

এদিকে মাদারীপুরের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলার চাহিদা মেটাতে ও মাটির তৈরি জিনিসপত্র বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে দিন-রাত ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে জেলার সাতটি গ্রামের পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের।

তাই তারা মনের মাধুরী মিশিয়ে মাটির তৈরি খেলনার আকৃতি দিচ্ছেন। মৃৎশিল্পীরা তৈরি করছেন মাটির গাছ, পাখি, ফুল, ফুলের টপ, ফলমূলসহ বিভিন্ন বাসন কোষন। কেউ মাটি গুঁড়া করে কাদা করছেন, কেউ মাটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করছেন, কেউবা বিভিন্ন পশুপাখির আকৃতি তৈরিতে ব্যস্ত। আবার কেউ মাটির তৈরি জিনিসপত্রে রং-তুলি দিয়ে হরেক রকমের নকশা করছেন।

অনেকে তৈরি পণ্যগুলো রোদে শুকাচ্ছেন। এই কাজে মৃৎশিল্পীরা তাদের কাজকে দ্রুত শেষ করতে তাদের ছেলে মেয়েরাও অংশ নিয়েছে। এই শিল্পের প্রধান উপকরণ মাটি। তাই মৃৎশিল্পীরা বিভিন্ন নদী থেকে মাটি সংগ্রহ করেন। চাকার মাধ্যমে মাটিকে বিভিন্ন আকৃতি দেওয়া হয় এখানে।

মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রাম, কালকিনি উপজেলার থানার মোড় এলাকার পালপাড়া গ্রাম, ডাসার থানার ঘোষেরহাট বাজার এলাকার পালপাড়া গ্রাম, শিবচর উপজেলার ভদ্রাসন ইউনিয়নের পালপাড়া ও নলগোড়া এলাকার পালপাড়া গ্রাম, রাজৈর উপজেলার বদরপাশা ও খালিয়া পালপাড়া গ্রামে প্রায় শতাধিক পরিবার এই মৃৎ শিল্পকে ধরে রেখেছে।

একই এলাকার গীতা পাল বলেন, বৈশাখী মেলা উপলক্ষে আমরা খেলনার পাশাপাশি ফুলের টব, সোনালি রঙের পাতিল, ঢোল, মগ, জগ, লবণ বাটি, বদনা ইত্যাদি তৈরি করছি। কারণ এগুলোর চাহিদা বৈশাখে আছে। এছাড়া এই কাজে আমার স্বামীকে নানাভাবে সাহায্য করি।

একই এলাকার আর এক মৃৎশিল্পী বলেন, আমাদের অনেক ইচ্ছা আমাদের ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা করাবো কিন্তু টাকার অভাবে তাও করাতে পারি না। সারা বছরই অভাবে সংসার চালাতে হয়।

কালকিনি উপজেলার থানার মোড় এলাকার পালপাড়া গ্রামের মৃৎশিল্পী সুমন পাল বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও বৈশাখী মেলার জন্য হরিণ, গরু, ঘোড়া, হাতি, খরগোশ, উটপাখি, হাঁস, বক, টিয়া, গন্ডারসহ নানা ধরনের প্রাণীর আকৃতি তৈরি করেছেন। এখন এসব শুকাতে দিয়েছি। দুই একদিনের মধ্যে সব তৈরি হয়ে যাবে।
এদিকে বৈশাখকে সামনে রেখে শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার কার্তিকপুর পালপাড়ার কুমার পল্লীর মৃৎশিল্পীদের কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে গেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, কার্তিকপুর পালপাড়ার কুমার পল্লীতে মাটির তৈরির এসব পণ্য তৈরির পর রোদে শুকানো, আগুনে পোড়ানো এবং রং করার প্রস্তুতি চলছে।

তবে মাটি, জ্বালানি, শ্রমিকসহ সব কিছুর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না মৃৎশিল্পী। তারপরেও পহেলা বৈশাখের চাহিদার কথা মাথায় রেখে তারা নতুন নতুন পণ্য তৈরি করে যাচ্ছে। 
মানুষের সভ্যতার আদি ও ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প বিলুপ্ত প্রায় তার পরেও এ পেশাকে টিকিয়ে রাখার জন্য কম বেশি প্রায় ১২ মাসই কাজ করে যাচ্ছে এই শিল্পীরা।

পহেলা বৈশাখে বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে এখনও মেলা বসে। আর সেই মেলা উপলক্ষে পাইকাররা দূর-দূরান্ত থেকে এসে এ সকল সামগ্রী কিনে নিয়ে যাচ্ছে বৈশাখী মেলায় বিক্রি করার জন্য। অপরদিকে পাইকাররা বলছে মাটির সামগ্রীর চাহিদা না থাকলেও এবার দাম বেশি চাচ্ছে। 

কার্তিক পুরের পাল পাড়ার ডিজাইনার রূপক পাল বলেন, আমার মৃৎ শিল্পটি ৩৩ বৎসর যাবত কাজ করে চালিয়ে রাখছি। তবে সফলতা ও পেয়েছি আমি বাংলাদেশ থেকে একটি কোম্পানি আড়ং এর মাধ্যমে আমার এ মাটির তৈরিপণ্য বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর লাভবান হয়েছি।

সারা বৎসর আমার এই মৃৎ শিল্পের তৈরিপণ্য বিদেশে রফতানির জন্য অর্ডার পেয়ে থাকি। কিন্তু আমি চাই আমার এই শিল্পটি আরো বড় হোক যাতে করে আমি সরাসরি দেশের বাহিরের বিক্রি করতে পারি।

আমাদের দেশের অনেক বেকার লোকের কর্মস্থান করতে পারি। আর এটাই আমার উদ্দেশ্য। রামভদ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিপ্লব সিকদার বলেন, আমাদের কার্তিকপুর পালপাড়ার মৃৎ শিল্পের তৈরি জিনিসপত্র এখন ইউরোপ আমেরিকা কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়।

সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের আরো প্রসার ঘটবে বলে মনে করে এই বিশেষজ্ঞ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ময়েজ উদ্দিন বলেন, এইসব শিল্পকর্ম জায়গাগুলোকে সমৃদ্ধ করছে, দেশের ঐতিহ্যকে যদি আমরা পৃষ্ঠপোষকতা করি তাহলে দেশের বাইরেও এই শিল্পকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। 


 

Admin

0 Comments

Please login to start comments