আন্তর্জাতিক

নির্বাচনে মমতার সামনে প্রতিবন্ধকতার পাহাড়, তবে চ্যালেঞ্জ গ্রহণে তিনিও প্রস্তুত


ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির বিরুদ্ধে যে কয়েকটি দল লড়াই করে যাচ্ছে, তার অন্যতম হলো অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (এআইটিসি)। তবে পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে (২০২১ সালের প্রথমার্ধে হওয়ার কথা) তৃণমূলকে যতটা হওয়ার কথা, ততটা শক্তিশালী মনে হচ্ছে না।

ঘনত্বের দিক থেকে বিহারের পর পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয় জনবহুল রাজ্য। এর জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। এর ৩০ ভাগ লোক মুসলিম। নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত থাকায় পশ্চিমবঙ্গ কৌশলগতভাবে শক্তিশালী। তবে মজার ব্যাপার হলো, রাজ্যটি উত্তর ভারতকেন্দ্রিক দল প্রায়ই প্রত্যাখ্যান করে।

তৃণমূল ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ে পড়ে। ওই সময় বিজেপি ৪২টির মধ্যে ১৮টিই জিতে নেয়। প্রাথমিক অবিশ্বাস ও কষ্টের পর গত বছর তৃণমূল উতরে যায়। আর তা হয় নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে সরকারের অপপ্রয়াসের কারণে। 

গেরুয়া দলটি বৈধ নাগরিকদের শনাক্ত, অবৈধদের আলাদা করে বহিষ্কার করার জন্য দেশব্যাপী জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে আসামে তা হিতে বিপরীত হয়েছে। রাজ্যটির প্রায় ২০ লাখ অবৈধ নাগরিকের অনেকেই হিন্দু। আসাম ও সেইসাথে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুরা ক্রুদ্ধ। দলিতদের একটি বিশাল সংখ্যক এসেছিল ওই সময়ের পূর্ব পাকিস্তান থেকে। তারা অভিযোগ করছে, এই প্রক্রিয়াটি উদ্বাস্তুদের স্বার্থের পরিপন্থী হয়েছে।

রাজনীতি বিজ্ঞানী ও পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু রাজনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সৌমেন চক্রবর্তী উল্লেখ করেছেন, দক্ষিণ বঙ্গের ৬৪ লাখ দলিত উদ্বাস্তু ২৯৪টি রাজ্য বিধান সভার আসনের মধ্যে প্রায় ৪৭টিতে প্রভাব বিস্তার করছে।

ফলে তৃণমূল ও এর প্রধান, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বিজেপিবিরোধী এই ভাবাবেগের সুযোগটি গ্রহণ করেছেন। কিন্তু ওই উল্লাস হয়েছে ক্ষণস্থায়ী। কোভিড-১৯ দুর্নীতি ও আম্পান সাইক্লোন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ত্রুটি তার জনপ্রিয়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দলটি আম্পানে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ২৭০ ডলার করে ক্ষতিপূরণের কথা ঘোষণা করেছিল। অনেকের কাছে এই সাহায্য গেলেও বেশির ভাগই তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

আবার আম্পানের পর থেকে বিজেপি ত্রাণ সহায়তা দিয়ে আসছে। তারা দাবি করছে, তাদের সহায়তায় কোনো দুর্নীতি হয়নি।

তাছাড়া ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে মমতা অসুবিধায় আছেন, সুবিধায় আছে বিজেপি।

ভারতে নানা রাজনৈতিক দলাদলি, বর্ণ, ধর্মীয় জটিলতার কারণে এক বা দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকা কঠিন ব্যাপার।

আবার ভারত শাসন করার জন্য সুশৃঙ্খল দলীয় সংগঠন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সিপিআই-এম ও বিজেপি এ দিক দিয়ে বেশ এগিয়ে আছে।

বামবিরোধী রাজনীতি থেকে উত্থান হওয়া মমতা সবসময়ে বলে আসছেন যে বাম জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়ন ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্কই পশ্চিমবঙ্গ থেকে পুঁজির বিদায় করেছে। এ কারণে তিনি সার্ভিস ডেলিভারি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রশাসনের মাধ্যমে সুশাসনের ওপর জোর দিয়েছেন।

তার সরকারি কার্যক্রম প্রশংসিত হলেও দুর্বল দলীয় সংগঠন জনগণের সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা জমিদারের মতো আচরণ করছেন, দুর্নীতিতে মজে আছেন, হিন্দুত্ববাদি মতাদর্শেও ঢুকে পড়ছেন। তৃণমূল যত সমস্যায় পড়েছে, তার বেশির ভাগের কারণ হলো সাংগঠনিক দুর্বলতা।

মমতাও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর বিষয়টি বুঝতে পেরে বলেছিলেন, আমি এখন দলের জন্য আরো বেশি কাজ করব। পশ্চিমবঙ্গের সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তিনি কেন সংগঠনকে অবহেলা করেছেন, তা বোঝা দায়। তিনি এখন নির্বাচন ব্যবস্থাপক ও কৌশলবিদ প্রশান্ত কিশোরকে ভাড়া করেছেন। তিনি বিজেপির হয়েও কাজ করেছেন।

অন্যদিকে বিজেপির মূল সংগঠন আরএসএসও কাজ করছে দীর্ঘ সময় ধরে। দিলিপ ঘোষ ১৯৮৪ সাল থেকে আরএসএস প্রচারক হিসেবে কাজ করেছেন।

গত ৫ বছর ধরে তিনি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নেতৃত্বে আছেন। তিনি এখন বিশ্বাসযোগ্য মুখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। তিনি লোকসভার নির্বাচনেও জয়ী হয়েছেন। তবে রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি তাকে মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে সামনে আনে কিনা তা দেখার বিষয়। 

নির্বাচনের ফলাফলের আগে বিজেপি তাদের মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থীর কথা ঘোষণা করে না। এখন ঘোষকে যদি সামনে নিয়ে আসা হয়, তবে লড়াইটি হবে নগরী বনাম গ্রামের মধ্যে। বিজেপি সেক্ষেত্রে বেশির ভাগ ভোটারের আবাস গ্রামের দিকে মনোযোগ দেবে।

তৃণমূ্লের আরেকটি সমস্যা হলো, তারা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি বোঝে না। হিন্দু জাতীয়তাবাদ পশ্চিমবঙ্গে অনেক পুরনো। কিন্তু তারা এখানে ভোটের রাজনীতিতে সুবিধা করতে পারেনি। ১৯৫১-৫২ সময়কালে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা প্রথম রাজ্য বিধান সভায় প্রবেশ করেছিল ১৩টি আসন পেয়ে।

তবে ২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের অবস্থান শক্তিশালী হয়। তারা মমতাকে মুসলিমপন্থী নেতা হিসেবে অভিহিত করে। বাস্তবে মমতা তা নন। কিন্তু তবুও হিন্দু স্বার্থের দোহাই দিয়ে বিজেপি এখানে ভোটাদের কাছে টানতে চায়। পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ বেশ গতি পেয়েছে। তবে মমতা এর বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন।

আরেকটি সমস্যা হলো সেক্যুলার ও মধ্য-বাম বিরোধী দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য। সিপিআই-এম ক্যাডার ও নেতাদের টার্গেট করা হয়েছে, পার্টি অফিস পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। আর এই সুযোগটি গ্রহণ করছে বিজেপি।

তাছাড়া সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের বিষয়টি ভালোভাবে বোঝে বিজেপি। তাদের আগ্রাসী মনোভাব, আর্থিক শক্তি, যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চাতুর্য তাদের উত্থানের কারণ।

অবশ্য তারপরও তৃণমূলের কিছু সুবিধা রয়েছে। প্রথমত এই দলের নেতা মমতা ব্যানার্জি বা দিদি দুর্নীতিহীন ও নির্ভীক গণনেতা হিসেবে পরিচিত। তার ক্যারিশমা আগের মতো না থাকলেও রাজ্য পর্যায়ে তো দূরের কথা জাতীয় পর্যায়ে একমাত্র নরেন্দ্র মোদি ছাড়া আর কারো নেই।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে এখনো তৃণমূলের শক্তিশালী নেতা আছে। তারা বাস্তব রাজনীতি বুদ্ধিসম্পন্ন। ভোটের রাজনীতি তারা বোঝে।

মমতার কাছে ১০৮৪ সালে সিপিআই-এম বর্ষীয়াণ সোমনাথ চ্যাটার্জিকে পরাজিত করার পর থেকে প্রতিটি নির্বাচন তার কাছে রাজনীতির জীবন-মরণ খেলা। কিন্তু তবুও ২০২১ সালে সম্ভবত তাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। তার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তার লড়াই করার সক্ষমতা। লড়াই যত কঠিন হয়, তিনি তত ভালোভাবে লড়তে পারেন। কিন্তু ২০২১ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব পরিচালিত যুদ্ধে তা কাজ করবে কিনা তা দেখার বিষয়। অবশ্য, লড়াইটি হবে দেখার মতো।

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments