স্বপ্নপূরণের পথে ৭৬ জাতের ধানবীজ উদ্ভাবন


সি নিউজ প্রতিবেদক : উদ্বৃত্ত চাল উৎপাদনের স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সেই স্বপ্ন ছোঁয়ার দিন এখন আর খুব বেশি দূরে নয়। ইতোমধ্যে উচ্চ ফলনশীল নতুন ৭৬টি জাতের ধানবীজ উদ্ভাবনে কাজ করছে সরকার। এর মধ্যে রোপা আমন মৌসুমের জন্য ৩৩টি, বোরো মৌসুমের জন্য  ৩৩টি, রোপা আউশ মৌসুমের জন্য ৪টি, বোনা আউশ মৌসুমের জন্য ৭টি জাত রয়েছে। 
কৃষি উন্নয়নে নতুন জাতের এ বীজ উদ্ভাবনে বদলে যাচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাÐ ও জীবন জীবিকার ধারা। উদ্ভাবন বিষয়ক এ প্রকল্প সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে সারাদেশে চাহিদার তুলনায় অধিক ধান উৎপাদন হবে। খাদ্যের কোনো সমস্যা থাকবে না বলে মনে করছেন কৃষি বৈজ্ঞানিক ও গবেষকরা।
তারা বলেছেন, আগামী ২০২১ সালের মধ্যে ৩৭ কোটি টন চাল উৎপাদনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। ধারাবাহিকভাবে এ সাফল্যের কারিগর হচ্ছে এদেশের কৃষক। আর কৃষকের নেপথ্যে রয়েছে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) আবিষ্কৃত অধিক ফলনশীল ৭৬টি নতুন জাতের ধান বীজ। ইতোমধ্যে এসব নতুন জাতের ধান বীজ রোপণ করা হচ্ছে। ধান চাষ করে কৃষকের মুখে আজ ফুটেছে হাসি।
প্রতিবছর ৩৪ কোটি টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে ১২০ টন বীজ ব্রি-থেকে কৃষকের মাঝে সরবরাহ করা হয়। সঠিকভাবে প্রকৃত কৃষকের মধ্যে সরবরাহ করা হলে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে ৩৭ কোটি টন চাল উৎপাদন করা সম্ভব। যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন ব্রি-’র কৃষি অর্থনীতি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ আবুবক্কর সিদ্দিক।
তিনি বলেন, প্রতিবছর ১২০ টন বীজ ব্রি থেকে ১ হাজার লাইসেন্সধারী ডিলারের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করা হয়। ডিলাররা যদি সঠিকভাবে প্রান্তিক পর্যায়ে প্রকৃত কৃষকের মধ্যে সরবরাহ করে এবং দেশে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, তাহলে আগামী ২০২১ সালে শতকরা ১০ ভাগ চাল বেশি উৎপাদন হবে। বর্তমানে আমরা ৩৪০ মিলিয়ন টন (৩৪ কোটি টন) চাল উৎপাদনের টার্গেট নিয়ে থাকি। এ থেকে সবমিলিয়ে ৩৭ কোটি টন চাল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। 
ব্রি’র বৈজ্ঞানিক ও গবেষকরা বলেছেন, বাংলাদেশ শুধু ডিজিটালের দিকেই এগোচ্ছে না। খাদ্য উৎপাদনসহ কৃষিতেও এগিয়ে যাচ্ছে তাল মিলিয়ে। বহুমুখী সমস্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেও এ খাতে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। ছোট আয়তনের এই দেশ এখন বছরে ৩৪ কোটি টন চাল উৎপাদনে সক্ষম। অল্প সময়েই খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য এনেছেন দেশের কৃষকরা। ধান উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে চাল রফতানি করে বাংলাদেশ ছুঁয়েছে আরেকটি মাইলফলক। কৃষির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাÐ ও জীবিকার ধারা। নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনে অর্থনীতির নতুন এক দিগন্ত দেখছে দেশবাসী। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার জ্বলন্ত উদাহরণ এ বছর শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের ৫০ হাজার টন চাল রফতানি। ধারাবাহিকভাবে এ সাফল্যের কারিগর এ দেশের লাখ লাখ সাধারণ কৃষক। কৃষকের শ্রম, কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকি, কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণা ও সরকারের সদিচ্ছায় ধান চাষ ও চাল উৎপাদনের এ রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। 
এ পর্যন্ত ব্রি চারটি হাইব্রিড ও ৭২টি ইনব্রিডসহ মোট ৭৬টি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে রোপা আমন মৌসুমের জন্য ৩৩টি, বোরো মৌসুমের জন্য  ৩৩টি, রোপা আউশ মৌসুমের জন্য ৪টি, বোনা আউশ মৌসুমের জন্য ৭টি, রোপা এবং বোনা আউশের উপযোগী ১টি এবং বোরো জাত আউশ মৌসুমে চাষ উপযোগী ১২টি জাত রয়েছে। 
তবে এখন পর্যন্ত আমন মৌসুমে সবচে জনপ্রিয় ধান বিআর-১১ এবং বোরো মৌসুমে সবচে জনপ্রিয় ব্রিধান ২৮ ও ২৯। প্রতিকুল পরিবেশ সহনশীলতা ও পুষ্টিগুন বিচারে ৭২টি ইাইব্রিড জাতের মধ্যে রোপা আমন মৌসুমের জন্য ৩৩টি, বোরো মৌসুমের জন্য  ৩৩টি, রোপা আউশ মৌসুমের জন্য ৪টি, বোনা আউশ মৌসুমের জন্য ৭টি,  রোপা এবং বোনা আউশের উপযোগী ১টি এবং বোরো জাত আউশ মৌসুমে চাষ উপযোগী ১২টি জাত রয়েছে। 
এছাড়াও প্রতিকুল পরিবেশ, সহনশীলতা ও পুষ্টিগুন বিচারে ৭২টি হাইব্রিড জাতের মধ্যে  ৮টি লবণ সহনশীল, ২টি জলমগ্নতা সহিষ্ণু, ২টি ঠাÐা সহনশীল, ২টি খরা সহনশীল ও ২টি খরা পরিহারকারী,৩টি জিঙ্কসমৃদ্ধ এবং সুগন্ধি ও রফতানি উপযোগী ৪টি জাত ধানের জাত রয়েছে।  
১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে উচ্চফলনশীল ধানের জাত এবং ধান উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে ব্রি। গত ৪৫ বছরে ধান উৎপাদন তিনগুণের বেশি বেড়েছে। ফলে ধান গবেষণায় ব্রি সারা বিশ্বে  খ্যাতি অর্জন করেছে।
ব্রি’র পরিচালক (গবেষণা) কৃষিবিদ মোহাম্মদ আবুল মোমিন বলেন, বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। সরকার ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (ব্রি) বিভিন্নভাবে তদারক করছে। ব্রির গবেষকদের মেধা ও কৃষকের শ্রম কাজে লাগানোয় এসেছে সাফল্য। 
ব্রি সূত্রে জানা গেছে, সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মৌসুম ও পরিবেশ-উপযোগী উচ্চফলনশীল (উফশী) ধানের জাত এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ফসল, মাটি, পানি, সারসহ নানাবিষয়ক কলাকৌশল উদ্ভাবন করছে। ব্রি উদ্ভাবিত ধানের জাত দেশের মোট ধানিজমির ৮০ ভাগে চাষাবাদ করা হচ্ছে। আর এ থেকে পাওয়া যাচ্ছে মোট উৎপাদনের ৯০ ভাগ। প্রতিষ্ঠানটি গবেষণার মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৭৬টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। 
ব্রি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিশ্বের ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ হলেও এখানকার হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৪.২ টন। চীন, জাপান ও কোরিয়ায় এ ফলন হেক্টরপ্রতি ৬ থেকে সাড়ে ৬ টন। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখার খাদ্য চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে ধানের ফলন বাড়ানোর বিষয়টি ভাবনায় এনে সনাতন জাতের ধান এবং মান্ধাতা আমলের আবাদ পদ্ধতি ছেড়ে উফশী ধান ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলা হচ্ছে বলে জানান গবেষকরা।

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments