জাতীয়

হাজারীবাগের বিষাক্ত মাটি, পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা!


সি নিউজ প্রতিবেদক ॥ ট্যানারির বর্জ্যে বিষাক্ত রাজধানীর হাজারীবাগের মাটি সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। তবে এ মাটি কোথায় ফেলা হবে কিংবা কোথা থেকে হাজারীবাগে মাটি আনা হবে সে বিষয়ে কিছুই জানে না প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বিষাক্ত এই মাটি মানুষের নাগালের বাইরে নেয়া হবে। কিন্তু ৬৫.৫৯ একর আয়তন বিশিষ্ট হাজারীবাগ এলাকার মাটি অপসারণ বা স্থানান্তর করতে হলে সমপরিমাণ আয়তনের জায়গা প্রয়োজন। এ আয়তনের জায়গা রাজধানী বা আশপাশে কোথাও প্রস্তুত করা হয়নি। ফলে প্রকল্পটি নিয়ে এরই মধ্যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।
পরিবেশবিদ ও নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নতুন এলাকাকে আবার বিষাক্ত করাটা হবে আত্মঘাতী কাজ। এজন্য আগে বিষাক্ত মাটির জন্য ডাম্পিং স্টেশন চূড়ান্ত করতে হবে। ওই এলাকা এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে যাতে পরিবেশ বা মানবদেহের কোনও ক্ষতি না হয়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ট্যানারির বর্জ্য থেকে হাজারীবাগ এলাকার মাটিতে ক্রোমিয়াম, লেড ও আর্সেনিকের মতো ভারী ও বিষাক্ত ধাতু মিশে গেছে। দূষণের মাত্রা অবস্থান ভেদে মাটির গভীরে ৮-২০ ফুট পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। এতে ভূ-গর্ভস্থ পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। বর্তমানে ওই এলাকায় গভীর নলকূপ ছাড়া বিশুদ্ধ পানির সন্ধান পাওয়া যায় না। ওই মাটিতে কোনও গাছ জন্মে না। বর্তমানে ওই এলাকায় যেসব গাছ আছে তা ক্রোমিয়াম ধাতুতে আক্রান্ত। পাশাপাশি পরিবেশের জন্যও এটা হুমকি হয়ে উঠেছে।
বিষাক্ত এই মাটি কোথায় স্থানান্তর করা হবে সে বিষয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা স্পষ্ট কোনও তথ্য দিতে পারছেন না। প্রকল্প কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম বলছেন, নির্দিষ্ট কোনও একটি স্থানে স্থানান্তর করে আধুনিক প্রযুক্তি ও কেমিক্যাল দিয়ে ওই মাটিকে বিশুদ্ধ করা হবে। এজন্য দু’টি পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে। প্রথমত, দূষিত মাটিতে বটগাছসহ এমন গাছ লাগালো হবে যেসব গাছ ফল দেয় না। দ্বিতীয়ত, অ্যারোভিক রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে মাটি শোধন করা যাবে। ফলে নির্দিষ্ট বছরের পর ওই মাটি বিশুদ্ধ হয়ে যাবে।
রাজউকের পরিসংখ্যান বলছে, হাজারীবাগে কোনও ইটিপি বা সিইটিপি ছিল না। ফলে প্রতিদিন ৭৫ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য ও ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার তরল বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি ড্রেন দিয়ে মাটি, পানি ও নদীতে গিয়ে পড়তো। ফলে এলাকার মাটি, পানি ও বায়ু দূষিত হয়ে পড়ে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রোমিয়াম মাটি ও পরিবেশের জন্য ধীরগতির বিষ। যা কখনও ধ্বংস হয় না বরং ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মাটির সঙ্গে মিশে থাকে।
আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিজ্ঞান ও উন্নয়নের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোতে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ ধরনের ৫০ টন কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়েছে। যার বেশিরভাগই বিষাক্ত। যার মাত্র ২০ শতাংশ চামড়া প্রক্রিয়াজাতের সময় চামড়া দ্বারা শোষিত হয়। বাকি ৮০ শতাংশই ড্রেন,নালা, রাস্তা ও জলাশয়ে বর্জ্য হিসেবে নির্গত হয়। এসব বর্জ্য শোধনের জন্য কোনও ইটিপি বা শোধনাগার নেই। ফলে ট্যানারি শ্রমিকের পাশাপাশি আশপাশের মানুষও জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এসব রাসায়নিক পদার্থের কারণে ফুসফুস, পাকস্থলি, শ্বাসনালীর ক্যান্সার হচ্ছে। এছাড়া মানুষের চিন্তাশক্তি কমে যায়।
২০১৩ সালে এই সংস্থার আরেক জরিপ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের শীর্ষ ১০টি রাসায়নিক ঝুঁকিবহুল এলাকার মধ্যে হাজারীবাগ একটি। ট্যানারির বর্জ্যের প্রভাবে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ সরাসরি স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হাজারীবাগে ৮ হাজারের বেশি শ্রমিক পরিপাক, চর্ম ও অন্যান্য বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত। ট্যানারি শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৯০ শতাংশ শ্রমিকই ৫০ বছর বয়সের আগেই মারা যায়।
হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর করা হলেও হাজারীবাগের মাটি ও পানিতে ক্রোমিয়াম থেকে গেছে। এ অবস্থায় জাপান ও সিঙ্গাপুরের আদলে হাজারীবাগ এলাকার ভূমির উন্নয়ন করতে চায় রাজউক। প্রকল্পের আওতায় হাজারীবাগের ৮ ফুট গভীর পর্যন্ত মাটি অপসারণ করে বিশুদ্ধ মাটি দিয়ে ভরাট করা হবে। যাতে দূষিত মাটি নতুন প্রকল্প এলাকা ও ভূ-গর্ভস্থ পানির ক্ষতি করতে না পারে। এজন্য এলাকার স্থানীয় জমি মালিকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক ও আলাপ আলোচনা করা হয়েছে। জমি মালিকরা ইতিবাচক সড়াও দিয়েছেন বলে জানিয়েছে রাজউক।
রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও ডিটেইল এরিয়া প্লান (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা গবেষণা করে দেখেছি হাজারীবাগের ৮-২০ ফুট পর্যন্ত মাটিতে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম ধাতু মিশে আছে। এজন্য আমরা ওই এলাকার মাটি অপসারণ করে মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে চাই। সেখানে মাটি কেমিক্যাল দ্বারা বিশুদ্ধ করা হবে।’ তবে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে সে বিষয়ে জানতে চাইলে নির্দিষ্ট কোনও স্থানের নাম জানাতে পারেননি তিনি।
এ বিষয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুস সোবহান বলেন, ‘শুধু প্রকল্প হাতে নিলে চলবে না। এজন্য আগে পর্যাপ্ত তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মাটিগুলো রাখার জন্য স্থান চিহ্নিত করতে হবে। এ নিয়ে অনেক গবেষণা করতে হবে। একই মাটি দিয়ে নতুন করে কোনও এলাকা দূষিত হবে না সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি বলেন, নেদারল্যান্ডেও এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দূষিত মাটিগুলোকে এমন স্থানে রাখা হয়েছে যেটা খুবই নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আবদ্ধ। ওই মাটিতে গাছ লাগানো হয়, কিন্তু তার ফল কাউকে খেতে দেয়া হয় না। এখন আমাদের দেশে যদি এটা বাস্তবায়ন করা হয় ভালো। এরপর ডাম্পিংয়ের জন্য যে স্থান নির্ধারণ করা হবে সেটাকেও নিরাপদ করতে হবে।
সম্প্রতি ক্যান্সারের জন্য ব্রয়লার মুরগিকেও দায়ি করা হচ্ছে। কারণ ব্রয়লার মুরগিকে ট্যানারির উচ্ছিষ্ট থেকে উৎপাদিত ফিড খাওয়ানো হয়। এর মাধ্যমে মুরগির শরীরে ক্রোমিয়াম প্রবেশ করে। যা চলে যায় মানুষের দেহে। এ বিষয় তুলে ধরে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এজন্য আমরা সুপারিশ করেছি, সেখানে মাটি ফেলা হবে সেখানে কোনও ফল গাছ লাগানো যাবে না। তবে দেবদারু ও বটগাছসহ কিছু গাছ আছে যেগুলো নিজে দূষিত জিনিস শোধন করে এবং পরিবেশকে ভালো কিছু দেয়। এসব গাছে কোনও ফলও হয় না। এভাবে ১৫-২০ বছর পরে ওই মাটি শোষিত হয়ে ভালো মাটিতে পরিণত হবে। তখন আর এই সমস্যাটি থাকবে না।’


 

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments