সম্ভাবনাময় আঁশ ফসল মেস্তা


সি নিউজ ডেস্ক : সম্ভাবনাময় আঁশ ফসল মেস্তা পাটজাতীয় ফসল মেস্তা থেকে উৎপাদিত চা, মেস্তা স্বত্ব, জ্যাম, জেলি, জুস, আচার ইত্যাদি বাজারজাত করা গেলে পাল্টে যাবে দেশের অর্থনীতির চিত্র।

পাট গবেষণা কেন্দ্র গবেষণার মাধ্যমে মেস্তা পাট থেকে এসব খাদ্যদ্রব্য তৈরি করলেও এর বাজারজাত কিংবা বাণিজ্যকরণের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। শিল্প উদ্যোক্তারা এগিয়ে না আসায় এ ফসলের হাজার কোটি টাকার সম্ভাবনা গবেষণাতেই আটকে আছে।

রংপুর পাট গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আবুল ফজল মোল্লা জানান, উপগুল্মজাতীয় এ উদ্ভিদের জনপ্রিয় নাম চুকুর। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নামে ফলটি পরিচিত। চুকুর পাতা রান্না করে তরকারি হিসেবে খাওয়া যায়। এর মাংসল বৃতি (শাঁস) থেকে চা, জ্যাম, জেলি, জুস, আচার ইত্যাদি তৈরি করা হয়।

চুকুরের পাতা ও ফলে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, কেরোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ‘সি’ ও অন্যান্য খাদ্য উপাদান রয়েছে। মেস্তা অর্থাৎ চুকুর পাতার চা হৃদরোগে উপকারী। এছাড়া এর পাতায় রয়েছে ক্যান্সার প্রতিশেধক উপাদান। এত গুণ থাকার পরও এর ব্যবহার শুধু গবেষণাগারে আটকে আছে। 

সরেজমিন দেখা গেছে, রংপুর পাট গবেষণা কেন্দ্রে চাসহ বিভিন্ন খাদ্য প্রস্তুত করে শুধু প্রদর্শনী ও অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। কোনো শিল্প উদ্যোক্তা এগিয়ে না আসায় এটি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

জানা গেছে, সবজি মেস্তার ইংরেজি নাম রোসেলা বা সরেল। এর পাতা ও ফলের মাংসল বৃতি (শাঁস) টক এবং সুস্বাদু। পৃথিবীর অনেক দেশেই সবজি মেস্তার বাণিজ্যিক চাষ করা হয় এবং খাদ্য হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। রংপুর ও রাজশাহীতে চুকাই, খুলনায় ও সাতক্ষীরায় অম্লমধু, ধামরাই এবং মানিকগঞ্জে চুকুল, সিলেটে হইলফা, কুমিল্লায় মেডশ, চাকমারা বলেন আমিলা, মগরা চেনেন পুং ও ত্রিপুরায় উতমুখরই নামে এ ফসল পরিচিত।

আবার কেউ কেউ বলেন হুগ্নিমুখুই। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় একে বলা হয় খড়গুলা। সব শব্দের সরল বাংলা অর্থ টক। ড. মো. আবুল ফজল মোল্লা বলেন, মেস্তা বেশ খরা সহিষ্ণু এবং পাটের তুলনায় কম উর্বর জমি- যেমন চরাঞ্চল ও পতিত জমিতে স্বল্প খরচে এর চাষ করা যায়।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট বন্য প্রজাতির মেস্তা (এম-৭১৫) থেকে বিশুদ্ধ সারি নির্বাচন ও গবেষণার মাধ্যমে অধিক ফলনশীল সবজি হিসেবে খাবার উপযোগী একটি উন্নত মেস্তার জাত উদ্ভাবন করেছে এবং জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ২০১০ সালে বিজেআরআই মেস্তা-২ (সবজি মেস্তা-১) নামে অবমুক্ত করা হয়েছে।

এর কান্ড তামাটে রঙের এবং শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট। কান্ড ও পাতায় কোনো কাঁটা থাকে না। পাতা আঙুল আকৃতির (খন্ডিত), পাতার কিনারা ঢেউ খেলানো, গাঢ় সবুজ এবং পরিণত অবস্থায় তামাটে লাল রং ধারণ করে। পাতার বৃন্ত ১০-১১ সেমি। ১৩০ থেকে ১৪০ দিনে গাছে ফুল আসে। ফুলের ব্যাস ৫ থেকে ৭ মিমি, দল হলদে, গোড়ায় মেরুন দাগ রয়েছে।

চুকুরের একটি গাছে ৪০ থেকে ৬০টি ফল ধরে। ফল অপ্রকৃত, ক্যাপসুল আকৃতির, ওপরের দিকে চোখা ও রোমমুক্ত এবং বৃতি পুরু ও মাংসালো। বীজ গাঢ় বাদামি, রেমিফর্ম ও কিডনি আকারের। 

চুকুরের ১ হাজারটি বীজের ওজন প্রায় ২০ গ্রাম। এর খৈল গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বীজ থেকে ২০ শতাংশ খাবার তৈল উৎপাদন হয়। মেস্তার তেলে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ পালসিটিক এসিড, ৬ দশমিক ৮ শতাংশ স্টিয়ারিক এসিড, ৫১ শতাংশ অলিক এসিড ও ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ লিনোলিক এসিড থাকে।

মেস্তার তৈল পৃথিবীর অনেক দেশে সাবান তৈরিতে ব্যবহার করা হয় এবং খাবার তেলে মেশানো হয়। পাটের চেয়ে সবজি মেস্তার বীজ বড় হওয়ায় জমি চাষ করার সময় মাটি তত মিহি না করলেও চলে। তবে এর শিকড় মাটির বেশ গভীর থেকেও খাদ্যরস সংগ্রহ করে, তাই জমি গভীর করে চাষ দেওয়া ভালো। জমির প্রকারভেদে আড়াআড়িভাবে দুই থেকে তিনবার চাষ ও মই দিতে হবে। আগাছা বাছাই করে ফেলতে হবে।

সবজি মেস্তা বৈশাখের প্রথম থেকে শ্রাবণের শেষ পর্যন্ত সময় বপন করা যায়। ছিটিয়ে বপন পদ্ধতির ক্ষেত্রে প্রতি হেক্টরে ১২ থেকে ১৪ কেজি এবং সারিতে বপন পদ্ধতির ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ কেজি পরিমাণ বীজ প্রয়োজন হয়। ফুল আসার পর উপযুক্ত সময়ে ফল পরিপুষ্ট হলে হাত দিয়ে ফল ছিঁড়ে অথবা মাংসল বৃতি (শাঁস) সংগ্রহ করতে হয়।

রংপুর পাট গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জানান, এত গুণের এ ফসল বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ শুরু করা গেলে খুব অল্প সময়ে পাল্টে যাবে দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির চিত্র। তবে এর থেকে উৎপাদিত চাসহ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী বাণিজ্যকরণ করতে বড় বাধা হলো কোনো শিল্পোদ্যোক্তা এগিয়ে আসছেন না। ]

এ ফসল বাজারজাত ও এর গুণাগুণ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পাট গবেষণা কেন্দ্র বিভিন্ন সভা-সেমিনার করে শিল্প উদ্যোক্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাচ্ছে না। শিল্প উদ্যোক্তারা এ ফসলটি নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments