সবুজ শিল্পের বার্তা দিচ্ছে পাট দিবস


সি নিউজ ডেস্ক : সোনালি আঁশ পাট। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে পাট ও পাটভিত্তিক অর্থনীতির অবদান সরাসরি জড়িত। ব্রিটিশ ভারত ও বাংলাদেশে স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থকরী ফসল ছিল  পাট। সে সময় বাংলার সব স্বপ্নই ছিল পাটকে ঘিরে। বাণিজ্য আয়ের তখনকার মূল উৎস ছিল পাট, যার জন্য পাট সোনালি আঁশ নামে পরিচিত ছিল।

গ্রামের বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাঠ-ঘাট, হাটবাজার সর্বত্র পাটের আঁশ শুকানো, প্রক্রিয়া করা, ক্রয়-বিক্রয়সহ দৈনন্দিন সব বিষয় ছিল পাট। গ্রামীণ বাংলায় এক উৎসবমুখর পরিবেশেরও উপলক্ষ ছিল পাট। মোট কথা, পাট ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ। পাটের এমন সোনালি অতীত ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে এখন রূপকথার গল্পের মতোই। যেখানে ধুঁকে ধুঁকে মরছে দেশের পাটসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ পুরো পাট শিল্প। 

এমন বাস্তবতায় দেশে এবার তৃতীয়বারের মতো জাতীয় পাট দিবস পালিত হলো। পাট দিবস কেন দরকার, কীভাবে এটা পালন করা হবেএসব বিষয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা এখন সময়ের দাবি।

পাট এক ধরনের দ্বিবীজপত্রী আঁশযুক্ত গাছ। এ গাছের সোনালি আঁশই ছিল একসময় দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত। কিন্তু আশির দশকের পর কম দামি প্লাস্টিকের পণ্য উৎপাদন ও এর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাটপণ্যের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। পাট উৎপাদনে এর খারাপ প্রভাব পড়ে।

অন্যদিকে সরকারি মিলগুলোর সীমাহীন লোকসানে দিন দিন এ খাতের অবস্থা নাজুক থেকে নাজুকতর হয়ে পড়েছে। যেখানে ১৯৭১ সালে ৭৫টি পাটকল ছিল, সেখানে ১৯৮২ সালে ৮২টি পাটকল আর বর্তমানে মাত্র ২২টি সরকারি পাটকল চালু আছে। যেগুলো আছে সেগুলো চলছে ধুঁকে ধুঁকে। হাতে গোনা কয়েকটি পণ্য যেমন পাটের বস্তা, সুতা ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকায় এবং বহুমুখী পণ্য উৎপাদনে অক্ষমতা ও পাটকলগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পাট শিল্প ৩-৪ দশক ধরে চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

অন্যদিকে প্লাস্টিকের ব্যবহার দিন দিন দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অবাক করার মতো। ইউএনইপির মতে, (ক) পৃথিবীর মানুষ প্রতি বছর ৫০ হাজার কোটি প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করে (খ) প্রতি বছর ৮০ লাখ টন প্লাস্টিকের বর্জ্য নদীনালা হয়ে সাগরে জমছে। প্লাস্টিকের এমন ব্যবহার চলমান থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে সাগরে মাছের চেয়ে প্লাস্টিক বেশি পরিমাণ থাকবে।

প্লাস্টিক ‘অপচ্য পদার্থ’, যা পচতে অথবা কারখানায় পুনঃপ্রক্রিয়াকরণে প্রচুর সময় লাগে। প্লাস্টিকের প্রায় ৯০ শতাংশ কমপক্ষে ৫০০ বছরে পচবে না। তাই প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশের ওপর দীর্ঘস্থায়ী মারাত্মক প্রভাব সৃষ্টি করছে। প্লাস্টিক মানুষ ও প্রাণীর উভয়ের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। শুধু তাই নয়, এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই প্লাস্টিকদূষণ বর্তমান সভ্যতার নয়া সংকট। প্লাস্টিকদূষণ রোধে বিশ্বব্যাপী নতুন কর্মসূচি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

১ দশক ধরে পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা ও উৎপাদনের গুরুত্ব সারা বিশ্বে বৃদ্ধি পায়। ইউনাইটেড নেশনস জেনারেল অ্যাসেম্বলি ২০০৯ সালকে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার অব ন্যাচারাল ফাইবার’ ঘোষণা করে।
পাট ১০০ শতাংশ বায়ো-ডিগ্রেডেবল ও রিসাইকেলেবল, যা পরিবেশবান্ধব। ২০০২ সালে বাংলাদেশে প্লাস্টিকপণ্য নিষিদ্ধ করা হয়।

এছাড়া পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য ‘পাটপণ্য ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইন, ২০১০’ করা হয়। সারা বিশ্বে যেমন ইউরোপ, আমেরিকা, চীনেও প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্লাস্টিকপণ্যের বিকল্প হিসেবে পাটের ঘুরে দাঁড়ানোর আরেকবার সুযোগ এসেছে।

বাংলাদেশ ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো ৬ মার্চ জাতীয় পাট দিবস পালনের ঘোষণা করে। সীমিত কিছু কর্মসূচির মাধ্যমে গত ২ বছর পাট দিবস পালন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পাটের গুণগত মান আজও বিশ্বসেরা। দেশের জনগণের এক-পঞ্চমাংশ পাট শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা এ শিল্পের সামনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কাজে লাগানোর এখনই সর্বোত্তম সময়। আর তখনই হবে পাট দিবস পালনের সার্থকতা। অন্যথায় এ শিল্প দুর্যোগের মধ্যেই থেকে যাবে।

বাংলা ভাষা দিবস পালন যেমন ভাষার সর্বত্র ব্যবহার, রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালন যেমন আর কোনো লাশের মিছিল নয়, ঠিক তেমনিভাবে সবুজ পাট শিল্প পুনঃপ্রতিষ্ঠাই পাট দিবস পালনের সার্থকতা হবে। সুুতরাং গতানুগতিক কোনো দিবস পালনের মধ্যে পাট দিবসকে সীমাবদ্ধ না রেখে কিছু করণীয়:

ক. পাটপণ্য পরিবেশবান্ধব। তাই পাট দিবসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পাটপণ্যের জনপ্রিয়তা সৃষ্টি করা। সরকারি-বেসরকারি অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারের জন্য সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা।

খ. ১ দশক আগে পাট ও ছত্রাকের জীবনরহস্যের (জেনোম সিকোয়েন্সি) উন্মোচন করেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম। এতে  Need Based Quality Fiber  উৎপাদনের পথ সুগম হয়। দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ও বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটকে পর্যাপ্ত গবেষণার ফান্ড ও অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করা, যাতে কোয়ালিটি ফাইবার উৎপাদনের জন্য নতুন বীজ উন্নয়ন করা এবং কৃষকদের কাছে তা বিতরণ করা।

গ. বহুমুখী পাটপণ্য তৈরি মানসম্মত পাট উৎপাদন ও প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে, সেজন্য কৃষকদের মানসম্মত পাট উৎপাদন ও প্রক্রিয়ায় কমপ্লায়েন্স অনুশীলন করার জন্য সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, পাট অধিদফতর জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটকে বহুমুখী পাটপণ্য গবেষণা ও বাজার উপযোগী পণ্য উন্নয়নে কাজে লাগানোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

ঘ. বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য জোট ডাইভার্সিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারকে (জেডিপিসি) শক্তিশালী ও তাদের কার্যক্রম গ্রাম পর্যায়ে বৃদ্ধির জন্য পদক্ষেপ নেয়া। এছাড়া কৃষক পর্যায়ে সমবায় সমিতির মাধ্যমে কৃষকদেরও উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উৎসাহ প্রদান করা। এতে গ্রামীণ পর্যায়ে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ঙ. বহুমুখী পাটপণ্য উন্নয়নের জন্য বিশেষ করে সরকারি মিলগুলোয় বহুমুখী মানসম্মত ফ্যাব্রিকস উৎপাদনের ব্যবস্থা করা এবং কম মূল্যে তা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যাতে পেতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা।

চ. পাটপণ্য ক্রয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও পাটপণ্যের ক্রেতা বৃদ্ধির জন্য পাটপণ্য মেলা, রোড শো, পাটপণ্য ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানকে কর সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে।

ছ. সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের গ্রিন ব্যাংকিংয়ের আওতায় পরিবেশবান্ধব পাটকে উপযুক্ত খাত হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

জ. পাঠ্যপুস্তকে পাট, পাট শিল্প, টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা। এতে বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।

ঝ. বৈদেশিক বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সবুজ কূটনীতি অনুশীলন করা। উল্লেখ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এক্ষেত্রে সবুজ কূটনীতি বহুমুখী পাটপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের কার্যকর কৌশল হতে পারে।

ঞ. বাংলাদেশে আগামী দিনের ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সবুজ শিল্পায়ন ছাড়া অর্থহীন। ক্ষতিকর প্লাস্টিক শিল্পের বিপরীতে পাট শিল্পের উন্নয়ন জরুরি। পাট শিল্পের শতভাগ কাঁচামাল দেশীয়। পাট শিল্পকে সবুজ অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য সবুজ শিল্প হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। তাই আগামীর বাংলাদেশে ব্লু ও গ্রিন ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে পাট শিল্প নীতি গ্রহণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।

উল্লিখিত পদক্ষেপের সফল বাস্তবায়ন ও পাটপণ্যের ব্যবহারই এ সবুজ শিল্পকে রক্ষা করতে পারে। জাতীয় পাট দিবস মূলত একটি সবুুজ শিল্পের বার্তা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে। আসুন ‘পাটপণ্য ব্যবহার করি, একটি সবুজ শিল্প রক্ষা করি।’

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments