জাতীয়

শোকের মাস আগস্ট: বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু


ড. আসাদুজ্জামান খান :  বাংলাদেশ-বঙ্গবন্ধু-মুক্তিযুদ্ধ- এই তিনটি শব্দ মূলত সমার্থক। এই তিনটির কোনোটিকেই আলাদা করে বিশ্লেষণ করার কোনো সুযোগ নেই। এক আত্মত্যাগী দেশপ্রেমিক নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার দেশ, তার জাতির কাছে এমনকি বিশ্ববাসীর কাছে তিনি ছিলেন হিমালয় সম ব্যক্তিত্ব।
১৯৪৭ সালে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন সেই দেশে দুই বছরের মধ্যে তাকে তিন তিনবার জেলে যেতে হয়েছে শুধু বাঙালির অধিকারের কথা বলার জন্য। বঙ্গবন্ধুর লেখনিতেই দেখা যাক সে কথা। ‘১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি জেলে আসলাম। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হয়েছে। আমার তিনবার জেলে আসতে হলো... গ্রেফতার করে আমাকে পাঠানো হলো ঢাকা জেলে। আমি জেলে আসার পর শুনলাম, আমাকে ডিভিশন দেয় নাই। সাধারণ কয়েদি হিসেবে থাকতে হবে। যাকে ইচ্ছা ডিভিশন দিতে পারে সরকার, আর না দিলে সাধারণ কয়েদি হিসেবে জেল খাটতে হবে। দুপুরে কিছুই খেলাম না। আমাকে হাজতে রাখা হয়েছে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে। আরো দুই তিনজন রাজনৈতিক কর্মীও সেখানে ছিল। তারা আমাকে তাদের কাছে নিয়ে রাখল। রাতে ওদের সঙ্গে কিছু খেলাম, কারণ খুব ক্ষুধা পেয়েছিল। মওলানা সাহেব ও শামসুল হক সাহেব পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে আছেন। তাদের ডিভিশন দেয়া হয়েছে। আমাকে ডিভিশন দেয়া হয় নাই বলে তাদের কাছে রাখা হয় নাই।’ (বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী)।
পাকিস্তান রাষ্ট্র বাস্তবায়িত হওয়ার পরপরই রাষ্ট্রটি সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঝুকছিল। যা বঙ্গবন্ধুর পছন্দ ছিল না। তিনি বলতেন- আমরা প্রথমেই পাকিস্তান থেকে সাম্প্রদায়িকতাবাদ নির্মূল করব। পশ্চিমাদের ততটা সমস্যা নয়, যতটা বাঙালিদের। ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ব্যবস্থায় তারা রাজি না হলে বাঙালিরা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের কথা চিন্তা করে দেখবে। তিনি আরো বলতেন- এ দেশে আগে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করব। যদি আমাদের গণতন্ত্র পশ্চিমাদের পছন্দ না হয়, তবে তারা মিলিটারি ‘ডিক্টেটরশিপ’ নিয়ে শান্তিতে বাস করুক। সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিসেবে আমরা পাকিস্তান থেকে তাদের বহিষ্কার করে দেব। কারণ লাহোর প্রস্তাবে সামরিক শাসনের কথা লেখা নেই, বলা হয়েছে গণতন্ত্রের কথা।
বঙ্গবন্ধু জানতেন এবং তিনি অনুধাবন করেছিলেন সভ্য জগতে কোনো রাষ্ট্রই ধর্মের ওপর ভিত্তি করে চলতে পারে না। রাষ্ট্রকে হতে হবে ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান- যার যার ধর্ম তার- তার অন্তরে, তার তার গৃহে। রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মের ধোঁকা দিয়ে শোষণ অব্যাহত থাকতে দেয়া যায় না।
বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু মুজিব সিদ্ধান্ত নিতে কখনোই বিলম্ব করতেন না। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখনই আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে তখনই তিনি তার প্রতিবাদ করেছেন, গর্জে উঠেছেন। যে কারণে পশ্চিমারা তাকে জোর করে বন্দি করেছে বার বার লাগাতার। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি প্রায় বলতেন- আমাদের ধীরে ধীরে যেতে হবে, ধাপে ধাপে যেতে হবে। শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষের জন্যইতো আমাদের সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম তিনি করেছেন ২৩ বছর যাবত এবং শেষ পর্যন্ত অপরিমেয় ত্যাগ স্বীকার করে ছিনিয়ে এনেছেন বাঙালির কাক্সিক্ষত স্বদেশ- বাংলাদেশ। সুকান্তের কবিতার মতো বলা যায়-
‘শাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়
জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।’
 

Admin

0 Comments

Please login to start comments