জাতীয়

শোকের মাস আগস্ট: ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু


ড. আসাদুজ্জামান খান :  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের গোড়াতেই তরুণ ছাত্রনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বিশাল ভারতবর্ষের কেন্দ্রস্থল কলকাতায় তখন তিনি কলেজের ছাত্র। ছাত্র মহলে তখন তার খুব নামডাক। সত্য আর ন্যায়ের সংগ্রামে কখনোই আপোষ করতেন না। ১৯৪৪ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দীন। বঙ্গবন্ধু কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে নাজিমুদ্দীনের বাসভবনে যান কিছু দাবি দাওয়ার বিষয়ে কথা বলার জন্য। কিন্তু ছাত্রদের ন্যায্য দাবি যখন খাজা নাজিমুদ্দীন কিছুতেই মানলেন না তখন বঙ্গবন্ধু রেগে গিয়ে বলেছিলেন- ‘ইউ লিডারস, ইউ হ্যাব বিট্রেড আস।’ একজন সাধারণ ছাত্রনেতা, দেশের মুখ্যমন্ত্রীর মুখের ওপর এমন স্পষ্ট কথা বলবে খাজা নাজিমুদ্দীন তা কখনো ভাবতেই পারেননি। সততা এবং নীতির প্রশ্নে কোনো আপস বঙ্গবন্ধু জীবনে কখনোই করেননি।
ছাত্র জীবনে স্বদেশি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন তিনি অবিভক্ত বাংলার গভর্নর স্যার জন হার্বাটের মৃত্যুর পর নতুন গভর্নর আর জে কেসির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের চরম বিরোধিতা করেন। যেখানে এদেশ থেকে ইংরেজ তাড়ানোর জন্য ছাত্র জনতা সংগ্রাম করছেন সেখানে বিদেশি শাসককে কেন সংবর্ধনা দেয়া হবে? সে সময় কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট নবাবজাদা লতিফুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বন্ধ করতে বলেন। শেষ পর্যন্ত নতুন গভর্নরকে আর সংবর্ধনা দেয়া হয়নি। পরবর্তীতে নবাবজাদা লতিফুর রহমান তরুণ শেখ মুজিবের দেশপ্রেম আর নীতিবোধের প্রশংসা করেন। সারা জীবন বঙ্গবন্ধু অন্যায়ের প্রতিবাদে সোচ্চার থেকেছেন।
ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এনেছেন পাকিস্তান। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে সংগ্রাম করেছিলেন তা সফল হয়নি। সে সময় ঢাকায় আয়োজিত এক সভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘দিল্লি থেকে খালি হাতে ফিরে এলেন সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বোস। কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ কেউ রাজি নয় তাদের প্রস্তাবে। তারা হাল ছেড়ে দেন। আমি দেখি যে, আর কোনো উপায় নেই। ঢাকায় এসে নতুন করে আরম্ভ করি। তখনকার মতো পাকিস্তান মেনে নিই। কিন্তু আমার স্বপ্ন কেমন করে পূর্ণ হবে এই আমার চিন্তা। স্বপ্ন পূরণ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও ছিল না। লোকগুলো যা কমিউনাল! বাংলাদেশ চাই বললে সন্দেহ করত। হঠাৎ একদিন রব উঠল, আমরা চাই বাংলা ভাষা। আমিও ভিড়ে যাই ভাষা আন্দোলনে। ভাষাভিত্তিক আন্দোলনকেই একটু একটু করে রূপ দিই দেশভিত্তিক আন্দোলনে। পরে এমন একদিন আসে যে-দিন আমি আমার দলের লোকদের জিজ্ঞাসা করি, আমাদের দেশের নাম কি হবে? কেউ বলে পাক বাংলা। কেউ বলে পূর্ব বাংলা। আমি বলি না, বাংলাদেশ। তারপর আমি শ্লোগান দিই জয় বাংলা। তখন ওরা বিদ্রƒপ করে বলে, জয় বাংলা না, জয় মা কালী। কী অপমান! সে অপমান আমি সেদিন হজম করেছি। আসলে ওরা আমাকে বুঝতে পারেনি। জয় বাংলা বলতে আমি বোঝাতে চেয়েছিলুম বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জয়। যা সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে।’ (বঙ্গবন্ধুর বাণী ও ভাষণ)।
বঙ্গবন্ধু সেই মহান পুরুষ যিনি একটি জাতিকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করেছেন স্বাধীনতা অর্জনের পথে এগিয়ে যেতে। দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত ছুটে বেড়িয়েছেন, ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তুলেছেন, স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছেন। তার চলার পথ মসৃণ ছিল না। তিনি নিজেই পথ সৃষ্টি করেছেন। অশুভ শক্তির মোকাবেলা করেই তিনি দৃপ্ত পায়ে এগিয়েছেন। অন্যায়ের কাছে কখনো পরাভব মানেননি এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রিয় বাঙালি জাতির স্বাধীন স্বদেশ ভূমি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু। তার মৃত্যুর পরে কবি সুফিয়া কামাল লিখেছিলেন-
‘ তোমার শোণিতে রাঙানো এ মাটি কাঁদিতেছে নিরবধি
তাইত তোমারে ডাকে বাংলার কানন গিরি ও নদী।’
 

Admin

0 Comments

Please login to start comments