দেশজুড়ে

শোকের মাস আগস্ট: কাঁদো বাঙ্গালি কাঁদো


ড. আসাদুজ্জামান খান : শুরু হলো আজ থেকে শোকবিহ্বল আগস্টের বেদনাবিধুর দিন। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের ১৫ তারিখে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা, স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। সমগ্র বাঙালির জন্য আগস্ট শোকের মাস। ১৫ আগস্টের রাত অভিশপ্ত রাত। এই রাতের প্রত্যুষকালে সেনাবাহিনীর কিছু উচ্ছৃঙ্খল সদস্য ৩২ নম্বর ধানম-ির বাসভবনে হানা দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। ওইদিন শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করা হয়নি, তার সঙ্গে জাতির পিতার সমস্ত স্বপ্ন ও আদর্শকে হত্যা করা হয়। স্তব্ধ করে দেয়া হয় তার আজীবনের চালিকাশক্তি বাঙালি জাতীয়তাবাদকে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিচয় প্রদানে যে কথাটি প্রণিধানযোগ্য- মূলত তিনি সেই মহান পুরুষ যিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা সমগ্র জাতির মস্তিষ্কে মুদ্রিত করে দিয়েছিলেন। তাইতো তার ডাকে সাড়া দিয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি জীবন-মরণ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি এই দেশ, মাটি আর মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন এবং তার মনের মধ্যে অংকিত হয়ে গিয়েছিল হাজার বছরের বাংলার মানচিত্র। আর সেই মানচিত্রের বুকে প্রোথিত হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা। বাঙালির চিরকালের সেই আবেগ, সেই অসাধারণ বাণী-
‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’
১৯৭১ সালে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ফলে আমরা পেয়েছিলাম স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। কিন্তু হঠাৎ করে এ যুদ্ধ শুরু হয়নি। দীর্ঘ তেইশ বছরব্যাপী যে আন্দোলন, সংগ্রাম তা ছিল প্রকৃতপক্ষে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। আধুনিক জাতীয়তাবাদ বা ন্যাশনালিজম ভূভিত্তিক চেতনা থেকে উদ্ভুত। একটি নিদিষ্ট ভূখ-ে বসবাসকারী জনগণের আত্মপরিচয় ও আশা-আকাক্সক্ষা সম্বন্ধে সম্মিলিত চেতনা ধর্মভিত্তিক বা গোষ্ঠীভিত্তিক বা সম্প্রদায়ভিত্তিক চেতনা নয়, এটি হলো প্রধানত এবং মূলত অসম্প্রদায়িক বা ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা। নিজেদের সাংষ্কৃতিক অভিজ্ঞান সম্পর্কে সম্মিলিত চেতনা থেকে এই জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা অংকুরিত হয়েছিল বিপ্লবী সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, তিতুমীর থেকে কিন্তু বঙ্গবন্ধু হলেন সেই ব্যক্তি- বাঙালি জাতীয়তাবাদের চারা যার প্রত্যক্ষ শুশ্রƒষায় ধীরে ধীরে একাত্তরে বিশাল মহিরূহের আকার ধারণ করে। তাইতো তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারক বাহক সংষ্কারক। পাকিস্তানি সামরিক শাসক গোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি এদেশকে বাংলাদেশ বলে অভিহিত করেছিলেন। জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে বাঙালি জাতির স্বাধীন সত্তাকে তথা জাতীয়তাবাদকে তিনি জাগ্রত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
জাতির অভিভাবক, পিতাকে হারানোর মাস এই আগস্ট। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে সমকালীন দেশের শ্রেষ্ঠকবি শামসুর রাহমানের কবিতার বর্ণনাই এসেছে তার চিত্রকল্প-
যখন সুবে সাদিক মুয়াজ্জিনের আজান
চুমো খেল শহরের অট্টালিকার নিদ্রিত গালে
তখন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে
কয়েকটি কর্কশ অমাবশ্যা ঢুকে পড়ল। অকস্মাৎ
তাঁর দিকে ছুঁড়ে দিল এক ঝাক দমকা বুলেট। ঈষৎ বিস্ময়-বিহবল
অথচ স্থির, অটল নির্ভীক তিনি অমাবশ্যার দিকে
আঙুল উচিয়ে টলে পড়লেন সিঁড়িতে।
                    (কবিতা: যাঁর মাথায় ইতিহাসের জ্যোতি-বলয়)
 

Admin

0 Comments

Please login to start comments