আন্তর্জাতিক

রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা: যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্যরা আগ্রহ দেখাচ্ছে না


সি নিউজ ডেস্ক : রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ কমছে। পশ্চিমা উন্নত দেশগুলো থেকে শুরু করে প্রতিবেশী ও মুসলিম বিশ্ব রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও আর্থিক সহায়তায় এগিয়ে আসছে না। রোহিঙ্গাদের সহায়তায় জাতিসংঘের নেতৃত্বে যে জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি), তার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিচ্ছে।

গত বছর মোট তহবিলের ৩৬ শতাংশ একাই জোগান দিয়েছিল দেশটি। চলতি বছরও এখন পর্যন্ত সংগৃহীত তহবিলের ৭১ শতাংশের বেশি জোগান দিয়েছে তারাই।

রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় অধিকাংশ দেশের আগ্রহ না থাকায় বড় ধরনের তহবিল ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে ২০১৮ সালে ৯৫ কোটি ডলারের চাহিদা প্রাক্কলন করা হয়েছিল। যদিও জোগাড় হয়েছিল এর চেয়ে অনেক কম। চাহিদার মাত্র ৬৯ শতাংশ বা সাড়ে ৬৫ কোটি ডলার সংগ্রহ হয়েছিল ওই বছর। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই দিয়েছিল ২৪ কোটি ডলার।

জেআরপির ২০১৮ সালের অর্থায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পর ওই বছর সবচেয়ে বেশি আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল যুক্তরাজ্য, যা সংগৃহীত তহবিলের ১৩ শতাংশ বা ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ৭ শতাংশ বা ৫ কোটি ডলার অর্থায়ন করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সাড়ে ৬ শতাংশ বা ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার জাপান, ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার অস্ট্রেলিয়া ও ২ কোটি ১০ লাখ ডলার দিয়েছিল কানাডা সরকার। এছাড়া সুইডেন ও নরওয়ে ১ কোটি ডলার করে অর্থসহায়তা দেয়।

তবে চলতি বছরের পরিস্থিতি আরো নাজুক। ৯২ কোটি ডলার চাহিদার বিপরীতে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার সংগৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে ১০ কোটি ৫৫ লাখ ডলারই দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর বাইরে অস্ট্রেলিয়া সরকার ১ কোটি ১০ লাখ, জার্মানি ৯১ লাখ, জাপান ৬২ লাখ, কানাডা ৪৫ লাখ ও ইউরোপীয় কমিশন ২৮ লাখ ডলার সরবরাহ করেছে। মাত্র ১০ লাখ ডলার দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্ব থেকে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় সাড়া পাওয়া যায়নি। প্রতিবেশী দেশ ভারত ত্রাণসহায়তা দিলেও জেআরপিতে কোনো অবদান নেই। জেআরপিতে কোনো ভূমিকা নেই চীনেরও।

একে দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, যে অর্থায়ন তা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্ব দিচ্ছে। কৌশলগত স্বার্থের জায়গা থেকে ভূ-রাজনৈতিক কারণে পশ্চিমা দেশগুলো সহযোগিতা করছে। কারণ মানবাধিকার ইস্যুতে তারা সোচ্চার। মুসলিম বিশ্ব বা ওআইসির দেশগুলোর এক প্রকার দায়বদ্ধতা রয়েছে। তারা মুখে যতটা প্রকাশ করে, বাস্তবে ততটা দেখা যায় না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সংকটে সহায়তার দিক থেকে এখন পর্যন্ত পশ্চিমা দেশগুলোই এগিয়ে রয়েছে।

অন্যান্য দেশের সহযোগিতার ধরন ভিন্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারত ত্রাণ দিয়েছে, রাখাইনে আশ্রয়ণ তৈরি করছে। তুরস্ক, মালয়েশিয়া ভিন্নভাবে সহায়তা দিচ্ছে। মুসলিম দেশগুলোর সহায়তার ধরন ভিন্ন। তারা নিজেরাই সহায়তা করে। আন্তর্জাতিকভাবে একত্রে সহায়তার কোনো নীতি নেই মুসলিম দেশগুলোর। তারা মূলত এককভাবেই করে। তবে বাংলাদেশে যে ক্যাম্প রয়েছে, এখানে যে অর্থসহায়তা দরকার, সে জায়গায় আমরা পশ্চিমা দেশগুলো ছাড়া অন্য কাউকে পাচ্ছি না।

২০১৮ সালে মোট ১২টি খাতে অর্থায়ন চেয়েছিল জাতিসংঘ। এসব খাতের চাহিদাও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল সংস্থাটি। কিন্তু তহবিল ঘাটতির কারণে সে লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি।

কক্সবাজারে অবস্থানকারী রোহিঙ্গা ও স্থানীয় ১২ লাখ ৯৪ হাজার ৫২০ জনের জন্য খাদ্যনিরাপত্তায় চাহিদা ধরা হয়েছিল ২৪ কোটি ডলার। এর বিপরীতে পাওয়া গেছে ১৬ কোটি ডলার। স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য চাহিদা ধরা হয়েছিল ১১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। তবে পাওয়া গেছে ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এখানে থাকা জনগোষ্ঠীর ৯ লাখ ৮ হাজার ৯৭৯ জনের আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এর মধ্যে ৮ লাখ ১৩ হাজার ২৮৯ জনকে আশ্রয়কেন্দ্রে দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এতে প্রয়োজন ছিল ১৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। তবে জোগাড় হয়েছিল ৩ কোটি ৩৯ লাখ ডলার।

এছাড়া রোহিঙ্গাদের জন্য ইউএনএইচসিআরের তৈরি করা ডব্লিউএএসএইচ (ওয়াশ) প্রকল্পে ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৫২০ জনের মধ্যে ১০ লাখ ৫২ হাজার ৪৯৫ জনকে নির্বাচন করা হয়েছে। এখানে ১৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারের বিপরীতে জোগাড় হয়েছে ৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার। নিরাপত্তা এবং এ-সংক্রান্ত সংকট মোকাবেলার জন্য ৭ কোটি ২০ লাখ ডলারের বিপরীতে পাওয়া গেছে প্রায় ৪ কোটি, সাইট ব্যবস্থাপনার জন্য ১৩ কোটি ১০ লাখের চাহিদার বিপরীতে ৫ কোটি ৬০ লাখ এবং শিক্ষার জন্য ৪ কোটি ৭০ লাখের জায়গায় পাওয়া গেছে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পুষ্টি সুরক্ষার জন্য ৫ কোটি ৭০ লাখের বিপরীতে পাওয়া গেছে সাড়ে ৩ কোটি ডলার, কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ৫৯ লাখের বিপরীতে ৪৩ লাখ, সমন্বয়ের জন্য ৬০ লাখের বিপরীতে ২২ লাখ, সরবরাহের জন্য ৩৬ লাখের বিপরীতে ৪০ লাখ এবং অন্যান্য খরচের জন্য ১২ লাখের প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে পাওয়া গেছে ৮ লাখ ৪৫ হাজার ডলার।

চলতি বছরও ১২টি খাতে সহায়তা প্রাক্কলন করেছে জাতিসংঘ। আগের জেআরপির মতো এবারও খাদ্যনিরাপত্তায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা ধরা হয়েছে। এ খাতে এ বছর চাহিদা ধরা হয়েছে ২৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর পরই সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছে ওয়াশ প্রকল্পে ১৩ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। এছাড়া আশ্রয়কেন্দ্র বাবদ ১২ কোটি ৮৮ লাখ ও স্বাস্থ্যসেবায় ৮ কোটি ৮৮ লাখ ডলার চাহিদা প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর বাইরে শিক্ষার জন্য ৫ কোটি ৯৫ লাখ ও পুষ্টির জন্য ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার চাহিদা নির্ধারণ করেছে জাতিসংঘ।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বাকি দেশগুলোর সহায়তায় আগ্রহ না থাকায় এসব লক্ষ্য অর্জন নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে খুব বেশি অর্থায়ন আশা না করলেও তারাই এক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা রাখছে। এখানে দেখার বিষয়, প্রতিবেশীরা কতটুকু অবদান রেখেছে। চীন ও ভারত রোহিঙ্গা সংকটে পুরো উল্টো ভূমিকা রেখেছে। এ দুটি দেশের কাছেই মিয়ানমার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে।

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments