বাংলাদেশ

রানওয়েতে আইএলএসের সনাতন প্রযুক্তি বর্ষায় উড়োজাহাজ অবতরণ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা


সি নিউজ ডেস্ক : আবহাওয়ার কারণে দৃষ্টিগোচরতা (ভিজিবিলিটি) কমে গেলে বিমানবন্দরের ইনস্ট্রুমেন্টাল ল্যান্ডিং সিস্টেম (আইএলএস) ব্যবহার করে উড়োজাহাজের নিরাপদ অবতরণ করাতে পারেন বৈমানিকরা। এক্ষেত্রে ক্যাটাগরি-১ ও ক্যাটাগরি-২ এই ২ ধরনের আইএলএস রয়েছে, যার মধ্যে ক্যাটাগরি-২ বেশি আধুনিক ও নিরাপদ।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট দেশের ৩ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে আইএলএস থাকলেও সেগুলো সনাতনী ক্যাটাগরি-১-এর। এই ৩ বিমানবন্দরে প্রযুক্তিটির আধুনিকায়ন না হওয়ায় ভিজিবিলিটি কমে গেলে উড়োজাহাজ উড্ডয়ন-অবতরণে সমস্যা পোহাতে হয় বৈমানিকদের। আসন্ন বর্ষা মৌসুমেও এ সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে তাদের। বিশেষ করে, দেশের ব্যস্ততম বিমানবন্দর হিসেবে এ সময় রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উড্ডয়ন-অবতরণ কার্যক্রমে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা রয়েছে।

কম ভিজিবিলিটির মধ্যে উড়োজাহাজ অবতরণ করাতে গেলে এমনিতেই বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা তৈরি হয়। উপরন্তু ভেজা রানওয়ে পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় বর্ষাকালে এ শঙ্কা বেড়ে যায় আরো অনেকখানি। বৃষ্টি ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে সৃষ্ট কম ভিজিবিলিটির মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে গিয়ে গত বছরের ২৪ জুলাই ব্যাংকক থেকে আসা একটি ফ্লাইট রানওয়ে থেকে ছিটকে যায়। এ ঘটনায় থাই এয়ারওয়েজের বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজটির ডান পাশের ছয়টি চাকা ফেটে যায়।

উড়োজাহাজটি সৌভাগ্যবশত সেদিন বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। ওই ঘটনার পর বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ ওঠানামা বন্ধ ছিল ২ ঘণ্টা।

ওই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, থাই এয়ারওয়েজের উড়োজাহাজটি অবতরণের সময় রানওয়ের নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে ১৫ ডিগ্রি দূরে সরে গিয়েছিল। খারাপ আবহাওয়ায় ভিজিবিলিটি কমার কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়। উপরন্তু রানওয়েতে অবতরণ করার পর উড়োজাহাজটির ডান ল্যান্ডিং গিয়ার কর্দমাক্ত মাটিতে পিছলে যায়। এ কারণে উড়োজাহাজটির ডান পাশের চাকাগুলো ফেটে গিয়েছিল।

শুধু বর্ষাকালে নয়, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের আকাশ প্রায়ই কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে। সে সময় ভিজিবিলিটি কম থাকায় রাতের বেলা শাহজালালে উড়োজাহাজ অবতরণে সমস্যায় পড়তে হয় বৈমানিকদের। মাঝেমধ্যে কুয়াশা বেড়ে গেলে কখনো কখনো রাত থেকে দুপুরের আগ পর্যন্ত উড়োজাহাজ অবতরণ বন্ধ রাখতে হয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে। বিশেষ করে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে এ সমস্যায় পড়তে হয় সবচেয়ে বেশি। এ সময়ে শিডিউলে থাকা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলোও বিলম্বিত হয়ে পড়ে। ঢাকামুখী ফ্লাইটগুলোকে অবতরণ করাতে হয় অন্য বিমানবন্দরে। এ শিডিউল বিপর্যয়ের প্রভাব পড়ে দিনের পরবর্তী ফ্লাইটগুলোতেও।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবহাওয়ার কারণে অন্যান্য দেশের বিমানবন্দরেও ভিজিবিলিটি নিয়ে এ ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। তবে আইএলএস ব্যবহার করে অনেক কম ভিজিবিলিটিতেও উড়োজাহাজ অবতরণ করানো সম্ভব। কিন্তু দেশের ৩ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে স্থাপিত আইএলএস ক্যাটাগরি-১-এর হওয়ায় এটি সম্ভব হচ্ছে না।

জানা গেছে, নিরাপদ অবতরণের জন্য ভিজিবিলিটি প্রয়োজন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৮০০ মিটার। কিন্তু কুয়াশাচ্ছন্ন ও মেঘলা আবহাওয়ায় ভিজিবিলিটি অনেক কমে আসে। সে সময় ক্যাটাগরি-১-এর আইএলএসের সাহায্য নিয়ে উড়োজাহাজ অবতরণ করতে নিরাপদ মনে করেন না বৈমানিকরা। অন্যদিকে এটিকে ক্যাটাগরি-২-এ আপগ্রেড করা হলে ৬০০ মিটার পর্যন্ত ভিজিবিলিটিতেও নিরাপদে উড়োজাহাজ অবতরণ করাতে পারেন বৈমানিকরা।

প্রসঙ্গত, আইএলএস হলো উড়োজাহাজ রানওয়েতে নিখুঁতভাবে অবতরণে সহায়তার জন্য স্থাপিত একটি পদ্ধতি, যেখানে বৈমানিকদের ভূমিতে অবতরণের জন্য উলম্ব ও আনুভূমিক গাইডেন্স দেয়ার জন্য ভিন্ন ভিন্ন দুটি বেতার তরঙ্গ একযোগে ব্যবহার করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইএলএস ক্যাটাগরি-১-এর ক্ষেত্রে কোনো কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলে তা পুনরায় চালু হতে সময় নেয় আট সেকেন্ড। ওই সময় কোনো ফ্লাইট আইএলএসের সহায়তায় অবতরণরত থাকলে প্রতি সেকেন্ডে সেটি রানওয়ে থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। এক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু এটিকে আইএলএস ক্যাটাগরি-২-এ আপগ্রেড করা হলে তাতে ব্যাকআপ পাওয়ার সিস্টেম যুক্ত করা হয়। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলেও সেকেন্ডের ভগ্নাংশেই আইএলএস সক্রিয় হয়ে ওঠে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বিরূপ আবহাওয়ার সময় ভিজিবিলিটি বাড়ানোর জন্য আইএলএস-২-এর জন্য তিনটি অনুষঙ্গ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এগুলো হলো প্রধান পাওয়ার সাপ্লাই, ব্যাকআপ জেনারেটর ও তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ (আইপিএস), যা ১ সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সক্রিয় হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বিমানবন্দরে কোনো আইপিএস স্থাপন করা হয়নি। ২০০৭ সালে বিমানবন্দরে ব্যাকআপ পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেম স্থাপনের জন্য উদ্যোগ নিয়েছিল বেবিচক। কিন্তু ছোট্ট এ কাজও ঝুলে আছে বছরের পর বছর।

বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডোর এ মোস্তাফিজুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরের আইএলএস ক্যাটাগরি-২-এ আপগ্রেডেশনের বিষয়টি অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবেই বিবেচনা করছি আমরা। এরই মধ্যে আপগ্রেডেশনের কাজ শুরু হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই এ নিয়ে একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে। প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফ্লাইট ক্যালিব্রেশন, যা এরই মধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অল্প কিছু আনুষঙ্গিক যেসব উপাদান বাকি রয়েছে, সেগুলোও দ্রুত কেনা হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, শিগগিরই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

Admin

0 Comments

Please login to start comments