বাংলাদেশ

রাজধানীর অধিকাংশ ভবনের ব্যবহার সনদ নেই


সি নিউজ ডেস্ক ঃ কোনো ভবন ব্যবহারের আগে ব্যবহার বা বসবাসের সনদ (অকুপেন্সি সার্টিফিকেট) গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রেখে প্রণয়ন করা হয় ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা, ২০০৮। তবে এ নিয়মের অস্তিত্ব শুধু কাগজ-কলমেই। ইমারত বিধিমালা কার্যকরের পর রাজধানীতে গত ১০ বছরে নির্মাণ হয়েছে ৪০ হাজারেরও বেশি ভবন। তবে রাজউক থেকে ব্যবহার বা বসবাসের সনদ সংগ্রহ করেছেন ২০০টির কমসংখ্যক ভবনের মালিক।

ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা, ২০০৮-এর ১৮ ধারায় ইমারত আংশিক বা সম্পূর্ণ নির্মিত হওয়ার পর তা ব্যবহার অথবা সেখানে বসবাসের জন্য বসবাস বা ব্যবহার সনদ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। ১৯ (১) ধারায়ও এর পুনরাবৃত্তি করে বলা হয়েছে, আংশিক বা সম্পূর্ণ বসবাস বা ব্যবহার সনদ পাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ কোনো অবস্থাতেই ব্যবহার করা যাবে না।

অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবনটি নির্মিত হয়েছে কিনা, তা পরিদর্শন করে ১৫ দিনের মাথায় এ সনদ পাওয়া যাবে বলে বিধিমালার ১৯-এর (৫) ধারায় উল্লেখ করা রয়েছে। বিধিমালায় ব্যবহার বা বসবাস সনদের মেয়াদ নির্দিষ্ট করা হয়েছে ৫ বছর। এ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই এটি নবায়ন করার বিষয়টিও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সনদ ছাড়া নির্মিত ভবনে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও পয়োনিষ্কাশনসহ কোনো ধরনের পরিষেবার সংযোগ না দেয়ার বিধান রয়েছে।

রাজউক বলছে, মালিকরা নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করেন বলে তাদের মধ্যে এ সনদ গ্রহণে কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। কারণ বসবাসযোগ্যতার সনদ গ্রহণের আবেদনের সঙ্গে কয়েকটি তথ্য জমা দিতে হয়। এগুলো হলো- ভবন নির্মাণের সমাপ্তি প্রতিবেদন, কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত স্থাপত্য নকশার ভিত্তিতে নির্মিত ইমারতের নির্মাণ নকশা, ইমারতের কাঠামো নকশা ও ইমারত সেবাসংক্রান্ত সব ধরনের নকশা। অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটলে এ সনদ পাওয়া যায় না বলে ভবন মালিকরা এটি গ্রহণ করেন না। যদিও এ সনদ গ্রহণ বা নবায়ন না করা ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি রাজউক।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বিধিমালাটি যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়ার ক্ষেত্রে রাজউকের ব্যর্থতাকেই বড় করে দেখছেন। তিনি বলেন, রাজউক যদি শুধু এ আইনটিরই বাস্তবায়ন ঠিকভাবে তদারকি করত, তাহলে রাজধানীতে বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা অনেক কম হতো। সংস্থা হিসেবে রাজউক নিজস্ব দায়িত্ব পালন না করে উন্নয়ন প্রকল্পেই বেশি আগ্রহী।

রাজউক তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবে আর সাধারণ জনগণ জীবন দিয়ে তার মাশুল দেবে, এটি মেনে নেয়া যায় না। তিনি বলেন, আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী অবকাঠামো তদারকির দায়িত্ব রাজউককে পালন করতে হবে, না হলে এটি কোনো তৃতীয় পক্ষের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। জানমালের নিরাপত্তায় কোনো ছাড় গ্রহণযোগ্য নয়।

ব্যবহার সনদ ছাড়াই ভবন ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় এক সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের শুরুর দিকে এক নির্দেশিকা জারি করে রাজউক। এর পরও খোদ সংস্থাটিকেই বিধানটি প্রয়োগে কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। রাজধানীর পূর্বাচল ও উত্তরা জোনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জানুয়ারিতে পরিচালিত এক অভিযানেও রাজউকের অকুপেন্সি সনদ ছাড়াই বিভিন্ন ভবনে পরিষেবা সংযোগ দেয়ার বিষয়টি উঠে আসে।

অকুপেন্সি সার্টিফিকেট প্রসঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, আগের বিধিমালায় অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেয়ার বিষয়টি ছিল না। নতুন বিধিমালায় বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। শতভাগ নিয়মের মধ্যে থেকে ভবন নির্মাণ হচ্ছে কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখছি, এরই মধ্যে কাজও শুরু করে দিয়েছি। বহুতল ভবন মালিকদের এ সার্টিফিকেট নিতে বাধ্য করা হবে। সার্টিফিকেট ছাড়া পরিষেবা সংযোগ না দেয়ার বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করা হবে। প্রয়োজনে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করব আমরা।

অনুমোদিত নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণের কারণে অগ্নিকান্ডে ক্ষয়ক্ষতিরও ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে বহুতল ভবনগুলোর ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি আরো বেশি। নির্মিত ভবনের সঙ্গে অনুমোদিত ভবনের নকশার মিল না থাকায় অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের বেশ সমস্যায় পড়তে হয়। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতিও বাড়ে।

বহুতল ভবনগুলোর ব্যবহার সনদ না থাকার পাশাপাশি নেই ফায়ার এক্সিটও। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স এ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ২০১৭ সালে পরিচালিত এক জরিপে  রাজধানীর অধিকাংশ বহুতল ভবনে ফায়ার এক্সিট না থাকার বিষয়টি উঠে আসে। ৯৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, তাদের ভবনে ফায়ার এক্সিট বা কোনো ধরনের বহির্গমন পথ নেই। কীভাবে ফায়ার এক্সিট ব্যবহার করতে হয়, সে বিষয়ে ধারণা নেই ৭৯ শতাংশের। ৭০ শতাংশ জানান, হঠাৎ কোনো দুর্যোগ হলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষক মেহেদী আহমেদ আনসারী এ বিষয়ে বলেন, রাজধানীর ১০তলা বা তারও বেশি বহুতল ভবনের অধিকাংশেই ফায়ার এক্সিট নেই। ২০১২ সালে আমরাও ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে ৫৩টি বহুতল ভবনে (১০ থেকে ২৪ তলা) ফায়ার কোড মানা হচ্ছে কিনা, তা যাচাই করেছিলাম। দেখা গেছে, ৫৩টির মধ্যে মাত্র চারটি ভবন (দুটি স্কুল ও দুটি হোটেল) পুরোপুরি কমপ্লায়েন্ট। আর ১০ শতাংশ ভবন কমপ্লায়েন্ট হলেও পুরোপুরি নয়। বাকি ৮০ শতাংশ ভবন কোড কমপ্লায়েন্ট হলেও ফায়ার কোড কমপ্লায়েন্ট না।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্যানুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে প্রায় ৯০ হাজার অগ্নিকান্ডের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৭৮ জন। এতে ক্ষতি হয়েছে আনুমানিক ২ হাজার ৯৯ কোটি টাকার বেশি। শুধু ২০১৮ সালে ১৯ হাজার ৬৪২টি অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ক্ষতি হয়েছে ৩৮৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এসব ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে ১৩০ জনের। ২০১৮ সালে কেবল ঢাকা বিভাগেই ৬ হাজার ২০৮টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে।

Admin

0 Comments

Please login to start comments