জাতীয়

যতটা বলা হয় তত খারাপ নয় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক


ভারতীয় হাই কমিশনারকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার মাস ধরে দেখা দিচ্ছেন না বলে সম্প্রতি একটি খবর বেশ আলোচনার খোরাক যোগান দেয়। এই খবরের জের ধরে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরেছে কিনা তা নিয়েও বেশ জল্পনা-কল্পনা চলে। অথচ, প্রকৃত ঘটনা তেমন কিছু নয়। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় কোন বিদেশী দূতের সঙ্গেই দেখা করেননি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

প্রকৃতপক্ষে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক আগের চেয়ে আরো ভালো হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক প্রস্তর-কঠিন এবং গত কয়েকটি বছর দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সোনালী অধ্যায়।

ভারতীয় কূটনীতিকরাও বলেন যে দুই দেশ হলো ঘনিষ্ঠ দুই ভাই। মহামারী শুরু হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শেখ হাসিনার অন্তত তিনবার অনলাইনে বিনিময় ও আলোচনা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে ব্যাপক অগ্রগতি দেখা যায়। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অংশীদারদের একটি ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক মিত্র বাংলাদেশ। বিনিয়োগের বিচারে বাংলাদেশে ২০১০ সালে ভারতের বিনিয়োগ যেখানে ছিলো ৪৩ মিলিয়ন ডলার তা ২০১৯ সালে ১১৬ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। আরো ৭২৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অপেক্ষায় আছে। ২০১৯ সালে ভারতে বাংলাদেশের রফতানি দাঁড়ায় ১.২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের দুই বছরের তুলনায় তিনগুণ। অথচ সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীনে বাংলাদেশের রফতানি ১ বিলিয়ন ডলার। 

২০১৪ সালেই দুই দেশের মধ্যে সামুদ্রিক সীমানা নিয়ে বিরোধ মিটে যায়। ২০১৫ সালে ছিটমহল বিনিময় দুই দেশের সম্পর্ক আরো উন্নত করার পথে বাধা দূর করে। তাছাড়া দুই দেশ বেসামরিক বিমান চলাচল, তথ্য প্রযুক্তি, বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা, জাহাজ চলাচল, জ্বালানি ও পর্যটন খাতে সহযোগিতা করছে এবং ৯০টির মতো সমঝোতা স্মারক সই করেছে।

কোভিড-১৯ মহামারীর সময় এই সহযোগিতা আরো জোরদার হয়েছে। প্রথমত, ভারতীয় কোম্পানি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস সরবরাহের কাজটি পেয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় রেলওয়ে কলকাতা থেকে বাংলাদেশের বেনাপোল পর্যন্ত কনটেইনার সার্ভিস চালু করেছে। সর্বশেষে, ভারত বাংলাদেশকে ১০টি রেল ইঞ্জিন দিয়েছে। 

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কিছু সমস্যা আছে, সে কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। যেমন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন এবং তারা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নকে সবসময় সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। ভারত যে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন করেছে তা উত্তর-পূর্ব ভারতের বিপুল সংখ্যক কথিত ‘বাংলাদেশী মুসলমানকে’ আঘাত করেছে। এতে বাংলাদেশের জনগণ উদ্বিগ্ন।

ভৌগলিক নৈকট্যের কারণেই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা শক্তিশালী করা দুই দেশের অভিন্ন প্রয়োজন। ভারতের জন্য, ভূ-কৌশলগত, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভূ-কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাংলাদেশ হলো ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সূচনাবিন্দু। ভারতের ভূরাজনৈতিক কৌশল কতটা অগ্রসর হবে তা নির্ধারণ করে দেবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে স্থল ও জলপথে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজগুলোতে পণ্য পরিবহন শিলিগুড়ি করিডোরের তুলনায় সময় ও অর্থ অনেক সাশ্রয় করবে। তাছাড়া, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নয়ন ভারতের উত্তরাঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে নিশ্চিত করতে পারে।

আঞ্চলিক সহযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেও ভারতের নেতৃত্বাধীন উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা ফ্রেমওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো বাংলাদেশ। বিশেষ করে মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল ইকনমিক কোঅপারেশন (বিমসটেক) ও বাংলাদেশ-ভুটান-ইন্ডিয়া-নেপাল (বিবিআইএন) সহযোগিতা কাঠামোতে বাংলাদেশের অবস্থান তালিকার শীর্ষে। 

আর বাংলাদেশের জন্য, পরাশক্তিগুলোর মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি পরিচালনা, বৈদেশিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং জাতিসংঘে তার ভূমিকা বাড়ানোর জন্য ভারতের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। পরাশক্তির কূটনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ চায় চীন ও ভারতের মধ্যে একটি ভারতসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করতে। সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য সে চীন ও ভারত দুই দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলছে। 

বৈদেশিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ প্রশ্নে, কোভিড-১৯ মহামারী বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে পারে ভারতকে দেয়া ট্রানজিট থেকে আয়। জাতিসংঘে বহুজাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে, ভারত গত জুনে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা, আন্তর্জাতিক বিষয়াদিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ, শান্তি ও উন্নয়ন অন্বেষা এবং অব্যাহতভাবে নিজের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের সঙ্গে মিলে গেছে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নয়ন কোন জিরো-সাম গেম নয়, বরং বহু পক্ষের জন্য সুফল বয়ে আনা একটি ভালো বিষয়। প্রথমত, দুই দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন। দ্বিতীয়ত, এটা দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার উন্নয়ন জোরদার করছে। আর শেষ কথা হলেও যা চূড়ান্ত শেষ নয়, কোভিত-১৯ মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় অবদান রাখছে এই সম্পর্ক।

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments