বাংলাদেশ

মেয়াদোত্তীর্ণ পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ: বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা  


সি নিউজ ডেস্ক : মেয়াদোত্তীর্ণ পাইপলাইনে চলছে ঢাকার গ্যাস সরবরাহ। সংযোগ লাইনে হচ্ছে লিকেজ, ঘটছে দুর্ঘটনা, পুড়ছে মানুষ। তিতাস গ্যাস বলছে, এসব পাইপলাইন বদলানো জরুরি। কিন্তু এ নিয়ে নেই কোনও পদক্ষেপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাইপলাইনের লিকেজ থেকে নিমতলী- চুড়িহাট্টার মতো বড় কোনও ঘটনা ফের ঘটে যেতে পারে। তাই নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে মানসম্পন্ন কোম্পানি দিয়েই এসব পাইপলাইন স্থানান্তর করতে হবে।

পাইপলাইনের লিকেজের কারণে সর্বশেষ গত বুধবার রাজধানীর কাঁঠালবাগান ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। দীর্ঘদিন থেকেই ওই এলাকার বিভিন্ন গ্যাস লাইনে লিকেজের অভিযোগ করে আসছিলেন এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, রাস্তায় হাঁটলে প্রায় সময়ই গ্যাসের গন্ধ নাকে আসতো। তবে তাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এর আগে ২২ ফেব্রুয়ারি জুরাইনের আইজি গেট এলাকায় গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজ থেকে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। তার দুদিন আগে রাজধানীর ধানমন্ডির শুক্রাবাদে গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন লাগলে যাত্রীসহ আটজন দগ্ধ হয়। এর আগেও চলতি বছর বেশ কয়েকটি এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের পরিচালক (অপারেশন) মোঃ কামরুজ্জামান বলেন, ‘তিতাসের বহু পাইপলাইন অনেক পুরনো হয়ে গেছে। এ কারণে লিকেজের ঘটনা ঘটছে। আমরা তাৎক্ষণিক মেরামতের কাজ করছি। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে যাতে এই সমস্যা আর না থাকে সেজন্য পুরনো পাইপলাইন বদলে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগির সেই কাজ শুরু হবে।’

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ‘গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে এবার পুরনো পাইপলাইন সরিয়ে নতুন করে পাইপ স্থাপনে বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। ১২শ কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নিশ্চিত হবে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ। আগামী ৩ বছরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। এরপরই নতুন সংযোগের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।’

১৯৬৭ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকা শহরে গ্যাস সরবরাহের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬৭-৬৮ সালে ডেমরা থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত ১২ ইঞ্চি এবং ডেমরা থেকে পোস্তগোলা ১৪ ইঞ্চি ও ১০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। চাপ প্রশমন করে ২ ইঞ্চি থেকে ৬ ইঞ্চি ব্যাসের বিতরণ নেটওয়ার্ক স্থাপন করে গ্রাহকদের গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়। এরপর থেকে নব্বই দশকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত ঢাকা শহরের বিভিন্ন অংশে ৫০ পিএসআই (প্রতি বর্গফুটে গ্যাসের চাপ) চাপের বিভিন্ন ব্যাসের বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়।

সেই নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ঢাকা শহর এলাকা ক্রমান্বয়ে বর্ধিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্কও সম্প্রসারণ করা হয়। ৫০ পিএসআই চাপের বিভিন্ন ব্যাসের বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়। এই পাইপলাইনগুলোর মেয়াদকাল ছিল ৩০ বছর। কিন্তু এখনও সেই পাইপলাইন ব্যবহার করছে ঢাকাবাসী।

জানা গেছে, তিতাসের মোট ১২ হাজার ২৫৩ কিলোমিটার পাইপলাইন রয়েছে। গ্রাহক সংখ্যা ২০ লাখেরও বেশি। মোট পাইপলাইনের মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ৭ হাজার। ঢাকার আশপাশে অর্থাৎ নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর এবং কিশোরগঞ্জে তিতাসের পাইপলাইন আছে।

বর্তমানে ঢাকা শহর বিতরণ নেটওয়ার্কে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপিত আছে। ১ম ও ২য় পর্যায়ের লাইনের মধ্যে প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার অনেক আগেই পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অল্প অল্প মেরামতের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ সচল রাখা হচ্ছে বলে জানান তিতাসের কর্মকর্তারা। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নমূলক কাজে রাস্তা মেরামত, ড্রেন নির্মাণ ও বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে গ্যাস পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে ক্যাথডিক প্রটেকশন (সিপি) ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে লিকেজের সৃষ্টি হচ্ছে। কম ব্যাসের পাইপগুলোর পুরুত্ব কম থাকায় লিকেজের পরিমাণ বাড়ছে। এছাড়া পাইপলাইনে পানি ঢোকায় গ্রাহক অংশে গ্যাস সংযোগে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

এই অবস্থায় চলতি মাসে তিতাস বেশকিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এজন্য ঢাকা শহরকে ১৪৩টি এলাকায় বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বল্পচাপ সমস্যা, ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন ও স্বল্প ব্যাসের পাইপ লাইন বিবেচনায় ১ম পর্যায়ে ৬০টি এলাকায় নেটওয়ার্ক উন্নীতকরণের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। এই কাজ করতে জিআইএস নকশাসহ আনুমানিক ২ হাজার কিলোমিটারের ২ ইঞ্চি থেকে ৪ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপনের দরকার হবে। এজন্য ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে। এরপর ২য় পর্যায়ে বাকি ৭৯টি এলাকায় নেটওয়ার্ক উন্নীতকরণ করা হবে।

পরিকল্পনার বিষয়ে তিতাসের জেনারেল ম্যানেজার (প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) মোঃ আব্দুল ওহাব তালুকদার বলেন, ‘ডিপিপি প্রণয়নের আগে পুরো ঢাকার কোথায় কোথায় পাইপলাইন বসানো হবে তার জরিপ করতে হবে। সেই কাজ শুরু করেছি। যেখানে রাস্তার নিচে পাইপলাইন আছে সেসব রাস্তার মাপ নেয়া হচ্ছে। পেট্রোবাংলা থেকে এই কাজের দর জেনে একটি দরপ্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে। কাজের জন্য আট সদস্যদের একটি কমিটি করা হয়। আমাদের ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই কাজ শেষ করবো।’ এতে কত টাকা ব্যয় হতে পারে জানতে চাইলে তিনি জানান, আনুমানিকভাবে ১২শ ২৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। তিতাসের নিজস্ব অর্থায়নেই এই কাজ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আমরা একটি নির্দেশনা পেয়েছি। তিনি বলেন, ‘আমরা ১৪৩টি ব্লকে কাজ করব। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৬০টি ব্লকে কাজ করব। দ্বিতীয় পর্যায়ে বাকি কাজ করা হবে ধারাবাহিকভাবে। আগামী ৩ বছরের মধ্যে পুরনো পাইপলাইন বদলে ফেলার লক্ষ্যেই বিশেষ করে ২০ থেকে ৩০ বছরের পুরনো পাইপলাইনগুলো বদলে ফেলতেই আমরা কাজ করছি। অনুমোদন পাওয়া গেলে আড়াই থেকে ৩ মাসের মধ্যেই কাজ শুরু করব। এতে একটি সমস্যা হতে পারে তা হচ্ছে রাস্তা কাটা। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পেতে একটু ঝামেলা হতে পারে। তাও আমরা কাটিয়ে উঠবো বলে আশা করি।’

এদিকে তিতাসের এই পুরো পরিকল্পনার বিরোধিতা করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘আমি মনে করি তিতাসের এত বড় কাজ করার সক্ষমতা নেই। সক্ষমতা থাকলে ৭ হাজার কিলোমিটার পাইপলাইনের মধ্যে ৫ হাজার পুরানো হয়ে গেছে, একের পর এক লিকেজের ঘটনা ঘটছে, বিস্ফোরণ এবং আগুনের ঘটনা ঘটছে আর তারা বসে আছে কেন?’

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেওয়ার পর তারা কাজ শুরু করেছে। অর্থাৎ এতদিন তারা বসেছিল। এত বড় কাজের দায়িত্ব সক্ষমতা আছে এমন তৃতীয় পক্ষকে দেওয়া উচিত। পাশাপাশি ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা রাখা দরকার।’ এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘তারা এতকাল যেসব কাজ করেছে তার অর্থ দাঁড়ায় সেগুলো তারা অপচয় করেছে। তারা এতদিন যেসব মেরামতের কাজ করেছে এখন তাদের খরচের হিসাব দিতে হবে। তাদের কাজের কোনও স্বচ্ছতা নাই।’

তিনি বলেন, এতদিনের পুরানো পাইপলাইন থেকে নিমতলী বা চুড়িহাট্টার মতো দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকেই যাবে। এ ধরনের ঝুঁকিপুর্ণ কাজ তাদের দিয়ে না করে সেফটি ও সিকিউরিটি মেইনটেনেন্স করেই এই কাজ দিতে হবে। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যোগ্য কোম্পানিকে এই কাজ দেওয়া যেতে পারে।’

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments