মাকড়সার জাল বোনার রহস্য

মাকড়সার জাল বোনার রহস্য

সি নিউজ : মাকড়সার নাম শুনলেই চোখের সামনে একটি ছবি ভেসে ওঠে আর তা হলো মাকড়সার জালের মাঝখানে একটি মাকড়সা বসে কেঁপে কেঁপে জাল বুনছে। সবার শরীরে এক ধরনের ঘিনঘিনে অনুভূতি জাগ্রত হয়। আসলে মাকড়সা কীভাবে জাল বোনে, কী এই জাল তা হয়তো আমরা অনেকেই জানি না। তা হলে জেনে নেয়া যাক মাকড়সার জাল বোনার রহস্য।
মাকড়সার জাল মূলত রেশম। মাকড়সার দেহে এই রেশম তৈরি করার জন্য থাকে বিশেষ এক গ্রন্থি। এদের তলপেটে থাকা বিশেষ অঙ্গের সাহায্যে এরা তরল রেশমকে খুব পাতলা সুতোয় পরিণত করে নির্গত করতে পারে। এই অঙ্গের সাহায্যে এরা সুবিধা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সুতা তৈরি ও নির্গত করতে পারে। কিছু কিছু মাকড়সা তাদের জীবদ্দশায় প্রায় আট ধরনের ভিন্ন ভিন্ন রকমের জাল বুনতে পারে!
সুতাগুলোর ধর্ম হলো এরা নির্গত হওয়ার সময় তরলই থাকে। কিন্তু বাতাসের সংস্পর্শে খুব দ্রুত শুকিয়ে যায়। রেশম সুতা নির্গমন শুরু হওয়ার পর মাকড়সারা এদের বিশেষ অঙ্গটিকে বাতাসে দুলিয়ে দেয়। যদি কখনো দুই গাছের মাঝখানে বড় মাকড়সার জাল দেখে থাকেন আর অবাক হন যে কীভাবে এটা সম্ভব হলো, জেনে নিন, আসল রহস্য কিন্তু বাতাস! মাকড়সার জালের সুতা এতটাই পাতলা যে বাতাস যতই মৃদুমন্দ হোক না কেন, এমনকি বিকিরিত তাপের ফলের মাটির সংস্পর্শে থাকা হালকা হয়ে যাওয়া বায়ুর দলুনিতেও এরা ভাসতে পারে। মাকড়সা ক্রমেই সুতা ছাড়তে থাকে এবং বাতাসে ভেসে ভেসে এই সুতা নিকটবর্তী কোনো গাছের গুঁড়ি বা দেয়ালে আটকে যায়। এরপর এরা সেই সুতা বেয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যায় আর জাল বুনতে থাকে।
প্রশ্ন দাঁড়ায়, এই জালগুলো এমন জ্যামিটিক আকৃতির হয় কেন? আর মাকড়সারাই বা কীভাবে এই কৌশল রপ্ত করে? আসলে মাকড়সাদের জাল বোনা এদের সহজাত প্রবৃত্তি। বলা যায় এটি জন্মগত গুণ। এই বিশেষ আকৃতি পুরো জালটিকে একত্রিত করে রাখে।
মাকড়সা তার জাল দিয়ে শিকারকে ফাঁদে ফেলে। আর যে কারণে প্রাণীগুলো জালে আটকা পড়ে সেটা হলো এই আঠালো জালের আঠা আসলে বিদ্যুৎ বা তড়িৎ পরিবাহী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য। ইলেক্টোস্ট্যাটিক  বৈশিষ্ট্যেযুক্ত কারণে এই আঠা মাকড়সার পুরো জাল জুড়েই থাকে। এর ফলে চার্জ বা আধানযুক্ত যে কোনো কিছু হোক তা ফুলের রেণু কিংবা কোনো কীটপতঙ্গ জালে এসে পড়লেই আটকে যায়।
মাকড়সা জালের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই জালের সাথে থাকা স্পাইরাল আঠা জালের কয়েক মিলিমিটার দূরত্ব পর্যন্ত পৃথিবীর বিদ্যুৎ বা তড়িৎ ক্ষেত্রকে বিকৃত করে ফেলে। এর ফলে কিছু কীটপতঙ্গ বিভ্রান্ত হয় ও তাদের এন্টেনার ‘ইলেকট্রিক সেন্সর’ তাদেরকে জালের কাছে নিয়ে আসে। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, পদার্থবিজ্ঞানের জটিল কিছু সূত্র অনুসারে, মাকড়সার জাল বাতাসে ভেসে বেড়ানো সব ধরনের বস্তুর দিকে এগিয়ে যায়। হোক সে পদার্থ বা জিনিস কিংবা কীট নেগেটিভ বা পজেটিভ চার্জের। এটা থেকে বোঝা যায়, কেন ও কীভাবে মাকড়সার জাল বিভিন্ন পোকাকে ফাঁদে ফেলে।
আর গবেষকদের মতে, পরিবেশ দূষণ রোধে মাকড়সার জাল ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ এই জাল খুব কার্যকরভাবে বায়ু দূষণকারী পদার্থ আটকে ফেলে পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে সাহায্য করে, যেটা অনেক ব্যয়বহুল যন্ত্রও করতে সক্ষম নয়। এই জালগুলো বৈদ্যুতিক আকর্ষণের মাধ্যমে দূষণ সৃষ্টিকারী পদার্থগুলোকে নিজেদের মাঝে আটকে ফেলে। তখন এই জালগুলো পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাতাসে কী পরিমাণ দূষণ সৃষ্টিকারী পদার্থ আছে তা পরিমাপ করা সম্ভব হবে। যেমন বাতাসে অতিরিক্ত পরিমাণে কীটনাশক পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেলে তা মৌমাছির জন্য ক্ষতিকর।