বাংলাদেশ

মাইকেল মধুসূদন দত্তের পরবর্তী বংশধরগণ


ড. আসাদুজ্জামান খান ॥ গতকাল ছিলো মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের (১৮২৪-১৮৭৩) ১৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভিত নির্মাণে যেসব মনীষীর অবদান অনস্বীকার্য তাদের মধ্যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত অন্যতম। প্রায় দেড় শতাব্দী পার হয়ে গেছে তিনি আমাদের মাঝে নেই কিন্তু রয়ে গেছে তার সৃষ্ট সাহিত্যকর্ম। কবির জীবন ও সাহিত্য নিয়ে প্রচুর আলোচনা ও লেখালেখি হলেও তার পরবর্তী বংশধরদের নিয়ে আলোচনা কিম্বা লেখালেখি তেমন একটা হয়নি। যে কারণে আজকের লেখায় বিষয়টির অবতারণা করা হয়েছে। ভারতের মাদ্রাজে অবস্থানকালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত নীলকর কন্যা রেবেকা টমসন ম্যাকটাভিসকে বিয়ে করেন। তাদের প্রথম সন্তানের জন্ম হয় ১৮৪৯ সালের আগস্ট মাসে। এ কন্যা সন্তানের নাম ছিল কেনেথ বার্থা ডটন। ১৮৫১ সালের মার্চ মাসে দি¦তীয় সন্তান ফিবি রেবেকা সালফেল্ট ডটনের জন্ম হয়। ১৮৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জন্মগ্রহণ করেন তৃতীয় সন্তান পুত্র জর্জ ম্যাকটাভিস ডটন। ১৮৫৫ সালের মার্চ মাসে জন্ম হয় তাদের চতুর্থ সন্তান পুত্র মাইকেল জেমস ডটনের। ১৮৫৫ সালে রেবেকার সঙ্গে মধুসূদনের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। ১৮৫৮ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিয়ে করেন এমিলিয়া হেনরিয়েটা সোফিয়া হোয়াইট নামের ইংরেজ (ফরাসি বলে কথিত) তরুণীকে। ১৮৫৯ সালে হেনরিয়েটার প্রথম সন্তান কন্যা এলাইজা শর্মিষ্ঠার জন্ম হয়। এরপর পুত্র মেঘনাদ মিল্টন দত্তের জন্ম। ১৮৬৭ সালের এপ্রিল মাসে জন্ম হয় পুত্র আলবার্ট নেপোলিয়ন দত্তের। মধুসূদন তার জীবদ্দশায় কন্যা শর্মিষ্ঠার জন্য পাত্র নির্বাচন করেন। পাত্র কলকাতা হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত অফিস এসিস্ট্যান্ট মি. উইলিয়াম ওয়ালটারাভিসন ফ্লয়েড। সঙ্গীত শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন ফ্লয়েড এবং প-িত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মধুসূদন ও হেনরিয়েটার মৃত্যুর দেড় মাস আগে তাদের একমাত্র কন্যা শর্মিষ্ঠার বিয়ে হয়। কিন্তু এ বিয়ে সুখের ছিল না, প্রায় আড়াই বছর পর ফলয়েড মৃত্যুবরণ করার পর বিপতœীক উইলিয়াম নিসের সঙ্গে বিয়ে হয় শর্মিষ্ঠার। তাদের একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। নাম উইলিয়াম ব্রাইটম্যান সামুয়েল নিস। দ্বিতীয় কন্যা সন্তান এলাইজা শর্মিষ্ঠা নিস। জন্মের বছরই সে মারা যায়। কন্যা সন্তান জন্মের চার দিন পর মধুসূদনের কন্যা শর্মিষ্ঠার মৃত্যু হয়। সামুয়েল নিস দশ সন্তানের জনক। তারা হলেন- ডানজিল, হ্যারোল্ড, মিস বেরিস, মিসেস লিওনারা আইভি, মিসেস রুবি ডটন, অ্যারল আর্থার ইভান গার্নেট, মিসেস কোরাল লিলিয়ান ও নরমান নিস। তাদের মধ্যে রুবি ডটনকে বিয়ে করেন মাইকেল পুত্র আলবার্ট নেপোলিয়নের পুত্র মাইকেল লরেন্স ডটন।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের দ্বিতীয় ও কনিষ্ঠ পুত্র আলবার্ট নেপোলিয়ন দত্ত। আলবার্ট মাতৃ-পিতৃহীন অবস্থায় বড় হয়েছিলেন। মাইকেলের বন্ধুদের সহায়তায় তার লেখাপড়া চলেছিল। তৎকালীন ভারত সরকার আলবার্টকে সরকারি চাকরি প্রদান করেছিল। তিনি বিয়ে করেন ক্যাথিলিন রেইচেল ব্রাউনিং নামে এক মহিলাকে। চাকরিরত অবস্থায় আলবার্ট একদিন লক্ষেèৗ শহর থেকে বাইসাইকেলযোগে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর তারিখ ১৯০১ সালের ২০ আগস্ট। আর ক্যাথিলিন বেঁচে ছিলেন ১৯৪৭ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত। তাদের দুটি পুত্র সন্তান মাইকেল লরেন্স ডটন ও নেভিল চার্লস ডটন এবং তিনটি কন্যা সন্তান ডরিস ডটন, নুমা ডটন, ক্যাথলিনা ডটন। পুত্র সন্তানদের মধ্যে লেভিস চার্লস ডটন নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি ভারত সরকারের আয়কর বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন। অন্য পুত্র মাইকেল লরেন্স ডটনও সরকারি চাকরি করতেন। তার পুত্র কন্যা পাঁচজন- মাইকেল উইলিয়াম ব্রাউনিং, লরেন্স ভিক্টর, পিটার অ্যারল মর্টন, ব্যাসিল প্যাটরিক নরম্যান, জেনিফার ডটন পেজ। জেনিফার পেজ আশির দশকে ভারতীয় বাস্কেটবল দলের অধিনায়িকা ছিলেন। তিনি ও তার স্বামী ডাঃ পেজ কলকাতা পিজি হাসপাতালের ডাক্তার। তাদের পুত্র লিয়েন্ডার পেজ ভারতের বিখ্যাত টেনিস তারকা। এ ছাড়াও মাইকেল মধুসূদন দত্তের বংশধররা ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছে বলে জানা যায়।
একদা বঙ্গজননীর কাছে কবি মিনতি করেছিলেন তাকে মনে রাখবার জন্য। বঙ্গজননী তার কথা শুনেছেন। বাঙালি আজো মনে রেখেছে তার একমাত্র মহাকবিকে। আর যশোরবাসী মধু কবির জন্মদিনকে ঘিরে মধুমেলা সাগরদাঁড়ির ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গায়ের লোক, এলাকার লোক তাদের গর্বের ধন মধুসূদনকে স্মরণে রাখতেই মধুমেলার আয়োজন করে প্রতি বছর। মধুকবিকে এই যে স্মরণ- তার রব কী পৌঁছায় অস্ট্রেলিয়ার ছোট্ট শহর কেলমস্কটে? যেখানে দিনরাত কাটে মধুসূদনের প্রপৌত্র- পুত্র মাইকেল ডটনের। তিনি সেখানকার সিনিয়র হাইস্কুলের অধ্যক্ষ। তার একান্ত ইচ্ছা অবসর পেলে একবার কপোতাক্ষ নদের তীরের প্রপিতামহের ভিটেই ঘুরে যাবেন আর তার সমাধীতে দেবেন পুষ্পমাল্য। যে সমাধীতে উৎকলিত রয়েছে - দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে।...

 

Admin

0 Comments

Please login to start comments