আন্তর্জাতিক

ভারতে সাধারণ নির্বাচন শুরু ১১ এপ্রিল


সি নিউজ ডেস্ক : ভারতের সাধারণ নির্বাচনের (লোকসভা) তফসিল ঘোষণা হয়েছে গতকাল। দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুনীল অরোরা গতকাল নয়াদিল্লীতে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ভারতের সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হবে আগামী ১১ এপ্রিল। ওইদিন শুরু হয়ে ১৯ মে পর্যন্ত মোট ৭ দফায় এ নির্বাচনের জন্য ভোট নেয়া হবে। ভারতের এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৯০ কোটি। ফলে দেশটির আসন্ন নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে ইতিহাসের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক চর্চার নিদর্শন হিসেবে। খবর আল জাজিরা।

তফসিল ঘোষণাকালে সুনীল অরোরা জানান, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে মোট ৭ দফায়। ১১, ১৮, ২৩ ও ২৯ এপ্রিল এবং ৬, ১২ ও ১৯ মে তারিখে এ ভোটগ্রহণ করা হবে। নির্বাচনের ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণা হবে ২৩ মে। ভারতের এবারের নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর আশঙ্কা, এটি ব্যবহার করে ভোট গণনায় জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হতে পারে।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর এ শঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে সুনীল অরোরা জানান, নির্বাচনকালে ভোটগ্রহণ কেন্দ্রগুলোয় ভোটার-ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রায়াল (ভিভিপিএটি) সিস্টেম ব্যবহার করা হবে, ফলে এখানে জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই।

ভিভিপিএটি মূলত এক ধরনের ডিভাইস, যা ইভিএমের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। ভোটার যাকে ভোট দিয়েছেন, সে প্রার্থীর নাম, ছবি ও প্রতীকসংবলিত ছোট একটি স্লিপ ভোট দেয়ার পর এখান থেকে প্রিন্ট হয়ে বেরিয়ে আসে, যা ব্যবহার করে পরবর্তীতে ভোট যাচাই করতে পারবে ইসিআই।

ইসিআই জানিয়েছে, নির্বাচনের জন্য এবার ভারতে মোট ভোটকেন্দ্রের প্রয়োজন পড়বে ১০ লাখ। অন্যদিকে ইভিএমের প্রয়োজন হবে ১১ লাখ।

ভারতীয় লোকসভায় মোট আসনসংখ্যা ৫৪৫টি। এর মধ্যে ৫৪৩টির জন্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন ভোটাররা। বাকি দুটি আসন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের জন্য বরাদ্দ। এ ২ আসনের সংসদ সদস্যদের নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা ভারতীয় প্রেসিডেন্টের ওপর ন্যস্ত করা রয়েছে।

টানা দ্বিতীয়বারের মতো ভোটযুদ্ধে নামতে যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অন্যদিকে তার দল বিজেপিকে ঠেকাতে মরিয়া ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসসহ দেশটির বিভিন্ন বিরোধী দল। এবারের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য মোদির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস সভাপতি এবং গান্ধী-নেহরু পরিবারের কুলতিলক রাহুল গান্ধী। প্রায় ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতের কয়েকশ রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে এ দুজনই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে।

নরেন্দ্র মোদির ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০১৪ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। ওই নির্বাচনে ভারতে ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ৮১ কোটি। এর মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিল মাত্র ৫৫ কোটি। চলতি বছর দেশটিতে ভোটারের সংখ্যা আরো সাড়ে ৮ কোটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০ কোটিতে।

তরুণ ভোটাররা এবারো লোকসভা নির্বাচনের জয়-পরাজয় নির্ধারণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। ভারতে মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশেরই বয়স ৩৫-এর নিচে। 

এবারো মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধসহ নানা ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইছে বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদী পলিটিক্যাল মেশিন। কিন্তু বিভিন্ন জনমত জরিপের তথ্য বলছে, কর্মহীনতা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিজেপির জনপ্রিয়তা কমছে। এমনকি এবার এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ২৭২ আসন না পাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে দলটির সামনে।

এদিকে পূর্বসূরিদের মতো দাপুটে নেতা হতে না পারার জন্য সমালোচিত রাহুল গান্ধী ইদানীং মোদির জন্য বেশ বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে গুরুত্বপূর্ণ ৩টি রাজ্যসভা (রাজস্থান, ছত্তিশগড় ও মধ্য প্রদেশ) নির্বাচনে জয়লাভ করেছে কংগ্রেস। এ ৩ রাজ্য আবার মোদি সমর্থকদের ঘাঁটি হিসেবে ‘কাউ বেল্ট’ অঞ্চলভুক্ত হিসেবে পরিচিত। এ থেকে মোদি সমর্থকদের দুর্গে ফাটল ধরারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ভারতের অর্থনীতি সামলানোয় মোদির পারফরম্যান্স নিয়ে এখন বেশ উচ্চকিত রয়েছেন রাহুল গান্ধী। ওই ৩ রাজ্যে বিজেপির পরাজয়কে মোদি সরকারের দরিদ্র কৃষকদের সহায়তায় অক্ষমতা ও কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থতার ফল হিসেবে প্রচার করছেন তিনি।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর বেশির ভাগ সময় ভারতের শাসনক্ষমতা ছিল কংগ্রেসের হাতে।

দেশটিতে মোট রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩ হাজার ৬২৬টি। এর মধ্যে ইসিআই স্বীকৃত দলের সংখ্যা ১ হাজার ৮৪১টি। এতগুলো দলের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ২ পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলার পথে ভারতজুড়ে বেশকিছু আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে রাহুল গান্ধীর দল কংগ্রেস। তবে দলটির জন্য আশঙ্কার বিষয় হলো, উত্তর প্রদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী দল সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টিকে জোটে টানতে ব্যর্থ হয়েছে কংগ্রেস। এ কারণে রাজ্যটিতে জয়লাভ করা কংগ্রেসের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। ভারতীয় লোকসভায় উত্তর প্রদেশের আসনসংখ্যা ৮০টি, যা চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করা ভারতীয় লোকসভার ১৮৬ জনের বিরুদ্ধে অতীতে অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ওই নির্বাচনের সময় নির্বাচন কর্মকর্তারা রাজনীতিবিদ ও তাদের সমর্থকদের কাছ থেকে মোট ৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ জব্দ করেন। ভোট ক্রয়সহ নানা বেআইনি কাজে এসব অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ১ কোটি ৬০ লাখ লিটার অ্যালকোহল ও ১৭ হাজার কেজি অবৈধ মাদকও এ সময় জব্দ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, মদ ও মাদকদ্রব্য সরবরাহের মাধ্যমেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে ভোট আদায়ের প্রয়াস চালিয়ে থাকে রাজনৈতিক দলগুলো।

এদিকে নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ছবি ব্যবহার করে কোনো ধরনের পোস্টার ছাপানো বা নির্বাচনী বিজ্ঞাপন সম্প্রচার না করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে ইসিআইয়ের পোল প্যানেল। ভারতীয় বিমান বাহিনীর আলোচিত বৈমানিক অভিনন্দন বর্তমানের ছবি ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে ক্ষমতাসীন বিজেপি, যা এরই মধ্যে বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

এ বিষয়ে ইসিআইয়ের ওয়েবসাইটে বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের ছবি ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ সশস্ত্র বাহিনী হলো, আধুনিক গণতন্ত্রের অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ অংশীদার।

Admin

0 Comments

Please login to start comments