আন্তর্জাতিক

ভারতের অর্থনীতিতে অব্যাহত ধস


অব্যাহত ধসের মুখে ভারতের অর্থনীতি। পরিত্রাণের কোন উপায় চোখে পড়ছে না। জাপানী বিনিয়োগ ব্যাংক নমুরা আভাস দিয়েছে যে ২০২০ সালে ভারতের জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির নেতিবাচক ৫ শতাংশ বা আগের বছরের তুলনায় এটি ৫ শতাংশ সংকুচিত হবে। আগে এই আভাস ছিলো নেতিবাচক ০.৫ শতাংশ। নমুরায়র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মূখ্য ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সোনাল ভার্মা বলেন, ‘এই সংশোধন থেকে বুঝা যায় লকডাউন বাড়ানো এবং তা এপ্রিল-জুন কোয়ার্টারে অর্থনীতিকে যেভাবে আঘাত করেছে সেটা আমাদের আগের আশঙ্কা থেকে অনেক বেশি গুরুতর।’

ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ব্রুকিং হাউজ আশা করছে যে ২০২১ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক ঘাটতি দাঁড়াবে জিডিপির ৭ শতাংশ। যা টার্গেট ৩.৫ শতাংশের দ্বিগুণ। আগে এ ব্যাপারে তাদের আভাস ছিলো ৫.১ শতাংশ।

সরকার এরই মধ্যে করোনা-আক্রান্ত অর্থনীতিকে সহায়তা করতে প্রণোদনা হিসেবে ১২ লাখ কোটি রুপি ঋণ নেয়ার নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা পূর্বের ধারণার চেয়ে ৫৪ শতাংশ বেশি। আরবিআই (ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক) কর্মকর্তারা সাউথ এশিয়ান মনিটরকে জানিয়েছেন যে নতুন করে ঋণ নেয়ায় বছর শেষে আর্থিক ঘাটতি দাঁড়াবে ৫.৫ শতাংশ।

দেশব্যাপী লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানোর ফলে ২১ অর্থবছরে ভারতের অর্থনীতি ০.৪ শতাংশ সংকুচিত হবে বলে মনে করেন গোন্ডম্যান সচের বিশ্লেষকরা। এপ্রিলে তারা বলেছিলেন, একই অর্থবছরে জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি কমবে ১.৬ শতাংশ।

আইএমএফ’ও ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১.৭ শতংশ কমিয়ে দিয়েছে। তবে এটাও নাকি খুবই আশাবাদী একটি হিসাব, এ কথা বলেছেন, কলকাতাভিত্তিক অর্থনীতিবিদ অজিতাভ রায়চৌধুরী।

তিনি সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, এর জন্য শুধু কোভিড দায়ী নয়, আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়া ভারতীয় অর্থনীতিকে আঘাত করেছে ভাইরাস। প্রধানমন্ত্রী মোদির নীতিগুলোর বড় ধরনের ব্যর্থতা এর জন্য দায়ী। 

২০১৯ সালের অক্টোবরে ভারতের পিএমআই (পারচেচিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স) দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন অবস্থানে নেমে আসে। ভোক্তাদের আস্থা ৩০ মাসের মধ্যে সবচেয়ে নিচু পর্যায়ে। বেকারত্ব তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেড়ে ৮.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে (সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি অনুযায়ী)। এমনকি ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে কোর সেক্টর আউটপুট গত ১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫.২ শতাংশ সংকুচিত হয়ে পড়ে। ভারতের অর্থনৈতিক সমস্যা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হওয়ার কারণ পুঁজিবাদের সঙ্গে অদ্ভুত দহরম-মহরম। ২০১৪ সালে যেখানে ব্যাংকের কুঋণ ছিলো ১০০,০০০ কোটি রুপি, সেখানে তা ২০১৯ সালে দাঁড়ায় ৬৬০,০০০ কোটি রুপিতে। চরম বেকারত্ব, ভোক্তা চাহিদা পড়ে যাওয়া এবং বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগে স্থবিরতা, সাদামাটা রফতানি, ব্যাংক এনপিএ-তে টুইন ব্যালেন্স শিট সমস্যার সমাধান না হওয়া, বিপুল সংখ্যক ইচ্ছাকৃত খেলাপী, এবং আইএলএফএস-এর কারণে সৃষ্ট এনবিএফসি খাতে ধস।

কোভিড শুধু পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটিয়েছে।

ভারত সরকারের উপাত্তের সততা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যেমন, কম্পটোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের রিপোর্ট যেখানে অবাক করে দিয়ে বলে যে প্রকৃত আর্থিক ঘাটতি ৫.৮ শতাংশ হবে, সেখানে সরকারের দাবি ৩.৪৬%। 

অনেক দিন ধরেই সরকার বেকারত্বের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান বাতিল করে এসেছে, যা ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত কয়েক বছর ধরে কৃষকদের আত্মহত্যার রেকর্ড জনসম্মুখে প্রকাশ করা হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সরকার কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পুরোপুরি উপেক্ষা করতে চাচ্ছে। অথচ এই খাতে ৫০% ভারতীয় কর্মরত। মোদি ২০২২ সালের মধ্যে শিল্প প্রতিষ্ঠানের আয় দ্বিগুণ করার যে দাবি করছেন সেটা পুরোপুরি লজ্জার, আক্ষরিকভাবে অসম্ভব, এটা অর্জন করাতো দুরের কথা এমনকি কল্পনাও করা যায় না। গত তিন বছর ধরে চমৎকার বৃষ্টিপাত হওয়ার পরও ২০১৪-১৯ মেয়াদে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি নগন্য ২ শতাংশ। এটা আগের কংগ্রেস সরকারের আমলের প্রায় অর্ধেক। তখন কৃষিখাতে প্রবৃদ্ধি ছিলো ৩.৮৫%।

মুদ্রাস্ফীতি-টার্গেটিংয়ে আচ্ছন্ন এই সরকার কৃষকদের ছুঁড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খামারের আয় অতলস্পর্শী, গত ১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। গ্রামীণ চাহিদা কমে যাওয়া এবং আনুষ্ঠানিক খাতের জন্য বিপর্যকর হয়েছে এবং অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতিকে আরো খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে মূল্য নিম্ন পর্যায়ে রাখার প্রচেষ্টায় সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে  সমাজের সবচেয়ে নাজুক অংশটিকে।

কোভিডের জন্য প্রথমে লকডাউন আরোপে বিলম্ব এবং পরে তড়িঘড়ি করে তা আরোপ করায় ভারতের অর্থনীতি মেরামতের অযোগ্য অবস্থায় চলে গেছে। প্রাণের দোস্ত পুঁজিপতিদের আনুকূল্য দেখাতে কুণ্ঠাবোধ করছেন না মোদি। কারণ তারা বিজেপির যুদ্ধতহবিল পূর্ণ করছে। ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে বিজেপি আনুষ্ঠানিকভাবেই রাজনৈতিক ডোনেশন হিসেবে ৮০০ কোটি রুপি পেয়েছে। তবে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের সূত্রগুলো জানায়, সত্যিকারের সংগ্রহ হয়েছিলো ১০,০০০ কোটি রুপি। এই তহবিল বিজেপিকে শুধু নির্বাচনেই জেতায়নি। পাশাপাশি যেসব রাজ্যে অবিজেপি সরকার ছিলো সেখানে বিরোধী রাজনীতিকেদের উদারহস্তে ঘুষ দিয়ে ওইসব সরকারের পতন ঘটানো হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের সন্দেহ এই ঘুষের বড় অংশ আসে ওইসব লোকের কাছ থেকে যারা একের পর এক ঋণ খেলাপী হয়ে চলেছেন। যাদের অনেকেই বিলিয়ন বিলিয়ন রুপি নিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মোদি সবচেয়ে অমার্জিত যে কাজটি করেছেন তাহলো সিরিয়াল ঋণ খেলাপীদের ৬৮,৬০৭ কোটি রুপির ঋণ মাফ করে দেয়া। এসব মাফ পাওয়া লোকদের মধ্যে মাল্টি-বিলিয়নিয়ার মেহুল চোকসি ও নীরব মোদির মতো লোক রয়েছেন। তারা দুই জনই দেশ থেকে পালিয়েছেন। এরা দুই জনই মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটের। তাদের ঋণ মাফ করা হয়েছে ‘ভারতের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হবে’ এই অযুহাতে।

কলকাতার প্রবীণ রাজনৈতিক ভাষ্যকার সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত বলেন, এটা একটি অপরাধী চক্র। সরকার এসব দুষ্কৃতকারীকে রক্ষা করছে যারা ব্যাংক লুট করছে এবং এই অবৈধ অর্থের একটি অংশ বিজেপিকে দিচ্ছে। আর সেই অর্থ গণতন্ত্রকে হত্যা ও সরকার উৎখাতের কাজে ব্যয় করা হচ্ছে।

২০১৬ সালের ১৬ মার্চ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী শীর্ষ ৫০ ব্যাংক খেলাপীর তালিকা জানতে চেয়েছিলেন। এতে বিষ্ময়ের কিছু ছিলো না। কিন্তু সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নন রঘুরাম রাজন চেয়েছিলেন ব্যাংকের ওয়েবসাইটের ‘নেম অ্যান্ড শেম’ বিভাগে এই ৫০ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করতে। সম্ভবত এ কারণেই তার মেয়াদ আর নবায়ন হয়নি। রাজন তার এক রিপোর্টে বলেন যে কুঋণের ৬০ শতাংশ মাত্র ২০ জন ব্যক্তির কাছে। এদের সবাই বিজেপি’র ঘনিষ্ঠ। ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফেরামে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছবিতে নীরব মোদির মতো অনেককে দেখা গেছে। ২০১৬ সালে দি ইকনমিস্টের এক জরিপে ভারতকে ক্রোনি ক্যাপিটালিজম ইনডেস্কে নবম স্থানে রাখা হয়।

অন্যদিকে অক্সফ্যাম ইন্ডিয়ার রিপোর্টে খোলামেলাভাবেই বলা হয়েছে যে দেশের বেশিরভাগ সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে। রাজন বলেন: আমার মনে হয় পুঁজিবাদ গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে কারণ এটা আর বেশিরভাগ মানুষকে যোগান দিচ্ছে না। আর এটা ঘটতে থাকলে ওই বেশিরভাগ মানুষ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। 

মার্চের শেষ থেকে যে লকডাউন চলছে তাতে ভারতে বেকারত্বের হার ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি প্রাইভেট (সিএমআইএ)-এর এক জরিপে এ চিত্র দেখা যায়। ২০১৯ সালের সরকার বেকারত্বের যে হার ৬.১ শতাংশ দিয়েছিলো সেটাই ছিলো বিগত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। করোনাভাইরাস সঙ্কটের কারণে ভারতের অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত ৪০০ মিলয়ন মানুষ আরো গভীর দারিদ্রে নিমজ্জিত হতে পারে। আইএলও’র হিসাবে এই সঙ্কটে চলতি বছরের দ্বিতীয় কোয়ার্টারে বিশ্বের ১৯৫ মিলিয়ন পূর্ণকালীন কাজ বা ৬.৭ শতাংশ কর্মঘণ্টা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। 

শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ জয়তি ঘোষ এ ব্যাপারে একমত। তিনি সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন: কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে যে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তা ভারতকে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। চলমান দেশব্যাপী লকডাউন ভারতের ইতিহাসে নজিরবিহীন বিঘ্নতা সৃষ্টি করেছে।

তিনি বলেন, এই বিঘ্নতা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে অনেক বেশি কঠিন। তখনও ভারতের আর্থিক খাত ও প্রকৃত চাহিদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। কিন্তু তখন উৎপাদন বন্ধ হয়নি।

তাছাড়া তখন সঙ্কট মোকাবেলার জন্য ভারতের অর্থনীতি অনেক ভালো অবস্থানে ছিলো। কারণ আগের বছরগুলোতে দ্রুত বাড়ছিলো এই অর্থনীতি। অন্যদিকে কোভিড-১৯ সঙ্কট এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে যখন জিডিপি’র প্রবৃদ্ধিতে মন্দা দেখা দিয়েছে। এটা যদি আগে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া শুরু করে তাহলে এখন তা খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments