জাতীয়

বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস আজ


ড. আসাদুজ্জামান খান॥  আজ ৩১ মে বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস। সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও এ বছর যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে দিনটি পালিত হচ্ছে। তামাক ব্যবহার বিশ্বের সকল প্রতিরোধযোগ্য রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। তামাকের কারণে সারা বিশ্বে প্রতি ৬ সেকেন্ডে একজন লোক ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিক, হাঁপানীসহ ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী নানা রোগে মৃত্যুবরণ করে।
বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবসের লক্ষ্য তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট রোগ সমূহ, আর্থিক ক্ষতি ও সামাজিক অবক্ষয় সর্ম্পকে সচেতনতা বৃদ্ধির ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা জোরদার করার মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা। পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশে ৪৩.৩ শতাংশ মানুষ তামাক (বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, গুল) ইত্যাদি ব্যবহার করে। গবেষণায় দেখা যায় দরিদ্র ৫৫.৬ শতাংশ ও নিরক্ষরদের ৬২.৯ শতাংশের মধ্যে তামাক সেবনের হার বেশী। ‘গ্লোবাল ইয়ুথ ট্যোবাকো সার্ভে ’-২০১৩ অনুসারে বাংলাদেশের ১৩-১৫ বছরের যুবদের মধ্যে তামাক ব্যবহারকারী ২.৯ শতাংশ এবং চর্বণযোগ্য তামাক ব্যবহারকারী ৪.৫ শতাংশ যুবকদের মধ্যে সিগারেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩.৪ শতাংশ এবং চর্বণযোগ্য তামাক ব্যবহারকারী ৫.৯ শতাংশ। তামাকের পিছনে অর্থ ব্যয়ে পরিবেশ, খাদ্য, শিক্ষা ও গৃহস্থালী কর্মকা-ের ওপর প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার অনুপাতে কৃষি জমির পরিমান এমনিতেই কম। তামাক চাষের কারণে দেশে খাদ্য জমি কমে যাচ্ছে। তামাক প্রক্রিয়াজাত করণে কাঠ ব্যবহারের কারণে বনভূমি উজাড় হয়ে যাচ্ছে।
তামাকের এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে জাতীয় বাজেটে প্রথমবারের মত সকল তামাকজাত দ্রব্যের ওপর ‘স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ’ আরোপ করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কতৃক ২০১৭-২১ সাল পর্যন্ত অসংক্রামক রোগ সংক্রান্ত অপারেশনাল কাজে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র কিছুই রেহাই পায়না। এটি মৃত্যু, অক্ষমতা ও দুঃখ দুর্দশা ডেকে আনে। এতে পরিবার, সমাজ ও জাতি অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সারা বিশ্বে তামাক ব্যবহারজনিত রোগের কারণে ব্যয়িত অর্থের পরিমান ১.৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিপুল পরিমান অর্থ সাশ্রয় করা গেলে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা যেত। বাংলাদেশ সরকার ‘বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবসে’ এর ক্ষতিকর দিক সম্পকে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকার তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করেছে। আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে টাস্কফোর্স এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে। ২০১৩ সালের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে সরকারি, বেসরকারি, পাবলিক প্লেসে ও পরিবহনে ধূমপান মুক্তকরণ এবং এ সকল স্থানে ধুমপান মুক্ত সাইন স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সকল ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তামাকজাত পণ্যের প্যাকেটের গায়ে ছবিসহ সরকার নির্ধারিত স্বাস্থ্য সর্তকবাণী প্রদান করার পাশাপাশি বাংলাদেশে তৈরিকৃত সকল তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে ‘শুধু মাত্র বাংলাদেশে বিক্রয়ের জন্য অনুমোদিত’ লেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করার ক্ষেত্রে দেশের সচেতন জনগোষ্ঠী, চিকিৎসক, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মরত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ কার্যকর অবদান রাখছেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তামাক জাতীয় দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব সম্প্রদায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আশা করা যায় সময়ের ব্যবধানে এসব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ফলে আগামীতে তামাক মুক্ত সমাজ ও দেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

Admin

0 Comments

Please login to start comments