আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা ব্রেক্সিট নিয়ে সংকটে


সি নিউজ ডেস্ক : ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বের হয়ে যাওয়া বা ব্রেক্সিট নিয়ে দেশটিতে যে চরম অনিশ্চয়তা চলছে, তাতে ব্রিটিশ-বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরাও এখন চরম উদ্বেগে আছেন। তাদের ব্যবসার ওপরও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অনেকে যুক্তরাজ্য থেকে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ইউরোপের অন্য দেশে। গতকাল বিবিসি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

খবরে যুক্তরাজ্যের অন্যতম সফল বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয় ইকবাল আহমেদকে। তিনি দেশটিতে সবচেয়ে বেশি চিংড়ি আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা করেন। এ জন্য তাকে যুক্তরাজ্যে ‘কিং অব প্রন’ বলেও ডাকা হয়। সানডে টাইমস যুক্তরাজ্যের শীর্ষ ধনীদের যে তালিকা করে, একবার সেই তালিকায় ইকবাল আহমেদের নামও উঠেছিল। তার মালিকানাধীন সিমার্ক গ্রুপের ব্যবসা এখন বিস্তৃত ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশে।

কিন্তু ব্রেক্সিট ঘিরে ৩ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, সে কারণে এখন তিনি দেশটি থেকে তার ব্যবসার একটা বড় অংশ নিয়ে যাচ্ছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।

বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইকবাল আহমেদ বলেন, ব্রেক্সিটের প্রথম ধাক্কায়ই আমরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। কারণ পাউন্ডের দাম একদম পড়ে গেল। তার পর এখন তো চলছে অনিশ্চয়তা। ইউরোপে আমাদের যারা কাস্টমার, তারা এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে, আমরা ওদের মালামাল সরবরাহ করতে পারব। আমরা তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছি যে, আমরা পারব। কিন্তু তার পরও ওরা উদ্বিগ্ন। ইকবাল আহমেদ জানান, তার সামুদ্রিক খাদ্য এবং অন্যান্য ব্যবসা তিনি পরিচালনা করেন ম্যানচেস্টার থেকে। ব্রেক্সিট নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর তিনি তার ব্যবসা আর সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। কারণ তাকে এখন বেশি নজর দিতে হচ্ছে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার দিকে।

তিনি বলেন, গত ৩ বছরে আমাদের কোনো এক্সপানশন হয়নি, ব্যবসায় যেটা আমাদের ন্যাচারালি হয়। কীভাবে আমরা ব্যবসা টিকিয়ে রাখব, সেটাই আমাদের সব সময় চিন্তা ছিল। ইউরোপের সঙ্গে আমার সামুদ্রিক খাদ্যের যে ব্যবসা, গত ২ মাসে সেটা আমি নিয়ে গেছি জার্মানি, বেলজিয়াম এবং পোল্যান্ডে। সেখানে আমরা নতুনভাবে সব কিছু সেটআপ করেছি। যদিও ব্যবসার মূল ম্যানেজমেন্ট আমি ম্যানচেস্টারেই রাখছি। কিন্তু ইউরোপে আমরা যে পণ্য বিক্রি করি, সেটা এখন আমরা ইউরোপেই প্রক্রিয়াজাত করব। এটা করার পরই এখন গ্রাহকরা আমাদের ওপর কিছুটা আস্থা ফিরে পেয়েছেন।

গত ৩ মাসে আমরা এটা করতে পেরেছি। কিন্তু তার এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাজ্য এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে- উল্লেখ করে ইকবাল আহমেদ বলেন, আমার এখানে যে দুইশ মানুষ ছিল, তাদের একশ জনের চাকরি চলে যাবে। কারণ ডিস্ট্রিবিউশন, অর্ডার পিকিং, ট্রান্সপোর্ট এগুলো আর এখানে এত দরকার হবে না। এখন এটা আমরা করব বার্লিনে, ব্রাসেলসে। সেখানেই নতুন কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু ব্রেক্সিট নিয়ে যুক্তরাজ্যে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত দেশটি ইইউ ছেড়ে না গেলে তিনি কী করবেন এমন প্রশ্নে ইকবাল আহমেদ বলেন, যুক্তরাজ্য যদি ইইউতে থেকেও যায়, আমরা কিন্তু ইউরোপের ব্যবসা ইউরোপেই রেখে দেব। শুধু আমি নই, আমার মতো আরও যারা ইউরোপে রপ্তানি করে, সবাই সবার ব্যবস্থা করে ফেলেছে।

যুক্তরাজ্যের এ অবস্থার জন্য দেশটির রাজনীতিকদের দোষারোপ করে ইকবাল আহমেদ বলেন, এটা তাদের ব্যর্থতা। কিছু রাজনীতিকের ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে আমরা সবাই আজ ভুক্তভোগী। 

তিনি আরো বলেন- যুক্তরাজ্য যদি ইইউ থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে আমাকে অন্যান্য দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে হলে হয়তো শুল্ক দিতে হবে বা আরও নানা সমস্যা হবে। হয়তো জিনিসপত্র আনতে দেরি হবে। আবার যখন রপ্তানি করব, তখন আমার পণ্যের দামও একটু বেশি পড়বে। কারণ এখন পাউন্ডের মূল্য পড়ে গেছে ইউরোর তুলনায়। যেমন জাপানে আমি রপ্তানি করি।

ইইউ এবং জাপানের মধ্যে একটা চুক্তি হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। এটা করার জন্য ৬ বছর ধরে ইইউ এবং জাপান কাজ করছিল। এই চুক্তির ফলে ইইউ দেশগুলো থেকে শুল্ক ছাড়াই জাপানে পণ্য রপ্তানি করা যায়। অথচ আগে দশ শতাংশের বেশি হারে শুল্ক দিতে হতো। যুক্তরাজ্য ইইউতে থাকার কারণে এই সুবিধাটা এখন আমি পাই জাপানে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে। কিন্তু যখন আমরা কোনো চুক্তি ছাড়া ইইউ থেকে বেরিয়ে আসব, তখন এ সুবিধা আর পাব না। ব্রেক্সিট নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তার রপ্তানি প্রায় ১৫ শতাংশ কমে গেছে বলেও জানান তিনি।

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments