জাতীয়

ফেব্রুয়ারিতেই বসছে পদ্মা সেতুর আরো দুটি স্প্যান


সি নিউজ প্রতিবেদক ॥ প্রমত্ত পদ্মার দু’পাড় জুড়ে দেয়ার মহাযজ্ঞ চলছে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া আর শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে। পুরোদমে এগিয়ে চলছে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ। যার যার কাজ নিয়ে সে সে ব্যস্ত, কারো যেন দম ফেলার ফুরসত নেই। সেতুতে একটি একটি করে স্প্যান বসানোর মধ্যে দিয়ে কার্যত দৃশ্যমান হচ্ছে সেতুর কাজ। নদীর বুকে যতোই দির্ঘায়িত দৃশ্যমান হচ্ছে সেতু ততোই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে দক্ষিণ জনপদের মানুষ। দক্ষিণ পাড়ের মানুষের অধরা স্বপ্ন ক্রমেই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। যে কারণে দির্ঘ বঞ্চনার শিকার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ বেজায় খুশি।
পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সমাপ্ত করার টার্গেট নিয়ে এগিয়ে চলছে সেতুর কাজ। সে লক্ষ্যে চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে পদ্মা সেতুতে বসছে আরও দু’টি স্প্যান। এর আগে গত ২৩ জানুয়ারি জাজিরা প্রান্তের আগের ৫টি স্প্যানের সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে ষষ্ঠ স্প্যান। সেতুর প্রথম বসা ‘৭-এ’ স্প্যানটির সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে জাজিরা প্রান্তের ‘এফ- ৬’ স্প্যানটি। জাজিরা প্রান্তে ৩৬ ও ৩৭ নম্বর খুঁটির ওপর এই স্প্যানটি বসিয়ে দেয়া হয়েছে। এই নিয়ে জাজিরা অংশে সেতু দৃশ্যমান হলো ৯০০ মিটার। আর মাওয়া প্রান্তে আরও দৃশ্যমান রয়েছে ১৫০ মিটার।
সূত্রগুলো জানায়, এখন থেকে নিয়মিতভাবে সেতুতে স্প্যান বসানোর কাজ চলবে। মাওয়ার কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে আরও স্প্যান প্রস্তুত করার কাজ বেশ দ্রুত গতিতে চলছে। এছাড়া ১৭টি স্প্যান প্রস্তুত রয়েছে। প্রস্তুত করা হচ্ছে আরও ১৮টি স্প্যান। সম্পূর্ণ হওয়া ৩৫টি স্প্যানের মধ্যে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে ১৯টি স্প্যান। বাকি ১৬টি স্প্যান চীন থেকে আসছে ।
২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম ‘৭-এ’ স্প্যানটি বসেছিল। এবার ৬ষ্ঠ মডিউলের স্প্যান বসানো শুরু হল। এই মডিউলের আরও দু’টি স্প্যান সব কিছু ঠিক থাকলে চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে বসবে। ‘৬ই’ নম্বর স্প্যানটি বসবে ৩৫ ও ৩৬ নম্বর খুঁটিতে। আর ‘৬-ডি’ স্প্যানটি বসবে ৩৫ ও ৩৪ নম্বর খুঁটি। ‘৬-ই’ ও ‘৬-ডি’ নম্বর স্প্যান সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে রং করে রাখা হয়েছে।
পদ্মা সেতুর দায়িত্বশীল প্রকৌশলীরা বলছেন, ‘৬-ই’ স্প্যান কনস্ট্র্রাকশন ইয়ার্ডের জেটির কাছেই ক্রেন লাইনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ‘৬-ডি’ এরই পাশে পেন্টিং শপে প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। এটি ২-১ দিনের মধ্যেই পেন্টিং শপ থেকে বের করে ইয়ার্ডের জেটির পাশের ক্রেন লাইনে রাখা হবে। আর ৩৫ নম্বর ও ৩৪ নম্বর খুঁটির কাজও প্রায় সম্পন্ন। এখন শুধু সার্টারিং খোলা এবং স্প্যান বসানোর প্রস্তুতি মূল কাজ। ফেব্রুয়ারিতেই এই দু’টি স্প্যান বসে যাবে।
এদিকে, গত জানুয়ারি মাসেই কেটে গেছে সেতুর নকশাজনিত সকল জটিলতা। এখন কাজের অগ্রগতি অনেক ভালো, সেতুর কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৬৩ শতাংশ। আর বাকি কাজ শেষ করতে তাই বাড়তি মনোযোগ প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের।
দায়িত্বশীল প্রকৌশলীদের মতে, পদ্মা সেতুর সার্বিক কাজ যে ভাবে এগুচ্ছে তাতে আগামী ২০২০ সালের প্রথম দিকেই পদ্মা সেতু ব্যবহারের উপযোগী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। নদীতে ৪০টি খুঁটির মোট ২৬২টি পাইলের মধ্যে ১৯২টি পাইলের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ১৪টি পাইলের বটম সেকশনের কাজ হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই এগুলোর টম সেকশন হবে। এদিকে মূল সেতুর মোট খুঁটি (পিয়ার) ৪২টি। এর মধ্যে ২০টি দৃশ্যমান রয়েছে। যার ১৬টির কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই দৃশ্যমান হচ্ছে আরও ১১টি খুঁটি। ৬,৭,৮, ৩১ ও ৩২ নম্বর এই পাঁচটি খুঁটিতেই পাইল বসেছে ৩টির বেশি। ৮,৩১ ও ৩২ নম্বর খুঁটিতে খাঁজকাটা (ট্যাম) পাইল বসানোর কাজ চলমান আছে। আর ২৮ জানুয়ারিতে থেকে ৬ ও ৭ নম্বর খুঁটিতে আরও ৪টি করে খাঁজকাটা কাটা পাইল বসানো শুরু হচ্ছে। বাকি ছয়টি অর্থাৎ ১০, ১১, ২৬, ২৭, ২৯ ও ৩০ খুঁটিতেও খাঁজকাটা পাইল বসবে। তাই সেতুর মূল ভিতের কাজ এখন শেষ পর্যায়ের চলে আসছে। এতে সেতু চালু হওয়ার কাজও এগিয়ে যাচ্ছে।
পদ্মা সেতুর প্রকৌশল বিভাগ থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বসানো হয় প্রথম স্প্যান। এর প্রায় ৪ মাস পর ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি দ্বিতীয় স্প্যানটি বসে। এর দেড় মাস পর ১১ মার্চ জাজিরা প্রান্তে ধূসর রঙের তৃতীয় স্প্যান বসানো হয়। এর ২ মাস পর ১৩ মে বসে চতুর্থ স্প্যান। এর এক মাস ১৬ দিনের মাথায় পঞ্চম স্প্যানটি বসে ২৯ জুন। আর ২৩ জানুয়ারি ৬ মাস ২৪ দিন পর বসলো ষষ্ঠ স্প্যানটি। তবে এর আগে ১২ অক্টোবর মাওয়া প্রান্তের ৪ ও ৫ নম্বর খুঁটিতে বসেছে ‘১এফ’ নম্বর স্প্যান।
ধীরে ধীরে পদ্মা সেতু দীর্ঘ হচ্ছে। দেড় শ’ মিটারের একটি একটি করে জাজিরা প্রান্তেই ছয়টি স্প্যান বসে গেছে। তাই যতোই দিন যাচ্ছে ততোই দীর্ঘ হচ্ছে পদ্মা সেতু। এরই মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুর অগ্রগতি আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। সেতুর দৃশ্যমান অগ্রগতিতে বেজায় খুশি দক্ষিণ জনপদের মানুষ।
ঝালকাঠির নলছিটির বাসিন্দা আব্দুর রহমান ঢালী বলেন, পদ্মায় এই বড় সেতু বানাইতে যে, কত ধরনের বড় বড় যন্ত্রপাতি দিয়া কাজ করতাছে, তা দেইখ্যা টাশকি লাগার মতন। কাছে থেইক্যা দেখবার সুযোগ পাইতাছি। অনেক অনেক ভাল লাগছে, বুঝাইতে পারতাছি না। আমরা আগাইয়া যাইতাছি। শেখ হাসিনা মোগো ভাগ্য খুইল্যা দিছে।’
শিবচরের ৬৫ বছরের মোঃ কোরবান মিয়া জানান, খুব খুশি লাগতাছে। কোনদিন কল্পনাও করি নাই, এই চরের মধ্যে ব্রিজ বারাইব। শেখের বেটি মোগো কথা চিন্তা কইর্যা ব্রিজ করতাছে । এই ব্রিজ মোগো ভাগ্য বদলাইয়া দিতাছে। কামাল হোসেন নামের একজন ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের যাতায়াত খুব সহজ হলো। এখন ঘর থেকে বের হইলেই ঢাকা। আর এই সেতুর কারণে আমাদের জায়গা জমির দাম বেড়ে গেছে। আমাদের গ্রাম এখন শহর হবে।
৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতুতে ৪২টি পিলারের ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান। আর দু’পারে ভয়াডাক্ট (সংযোগ সেতু) রয়েছে আরও প্রায় ৩ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে সেতুটি হচ্ছে ৯ দশমিক ৮২ কিলোমিটার। সংযোগে সেতুও তরতর করে উঠে যাচ্ছে। পদ্মা বহুমুখী সেতুর মূল আকৃতি হবে দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে এ সেতুর কাঠামো।

Admin

0 Comments

Please login to start comments