প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বাজেটে ভর্তুকি প্রণোদনা ও ঋণ খাতে বরাদ্দ বাড়ছে 


সি নিউজ ডেস্ক : গত ৪ বছরের ধারাবাহিকতায় সরকার ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। প্রাথমিকভাবে এর পরিমাণ হতে পারে ৪২ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

যা চলতি অর্থবছর থেকে ৪ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা বেশি। কৃষি, খাদ্য, তৈরি পোশাক, পাট, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ খাতে এই সুবিধা দেওয়া হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বাজেটকে গ্রামবান্ধব করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এ লক্ষ্যে প্রণোদনা, ঋণ ও ভর্তুকি বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ অবকাঠামোতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। একইসঙ্গে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোরও পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রণোদনা ও ঋণখাতে জিডিপির ১.৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে। প্রদর্শিত ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ প্রকৃত ব্যয় এর আগের অর্থবছরগুলোর তুলনায় বাড়লেও জিডিপির শতকরা হিসাবে তা অপরিবর্তিত রয়েছে।

নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির জন্য অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি চলতি বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বাড়ানো হবে। ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো হবে ১৬.৭ শতাংশ।

পরিবেশ ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ১১ শতাংশ, আমদানি খাতের প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশ ও রেমিটেন্স প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই হিসাব মাথায় রেখে নতুন সরকারের জন্য এসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সাধারণত ভর্তুকি বেশি দেয়া হয় কৃষি ও খাদ্য খাতে। আর প্রণোদনা বেশি দেয়া হয় কৃষি, পোশাক রফতানি ও পাট খাতে। নগদ ঋণ দেয়া হয়ে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ (পিডিবি) অন্যান্য সংস্থাকে।

তবে বিপিসি, পিডিবিকে যে নগদ ঋণ দেওয়া হয় সেগুলোকে একধরনের ভর্তুকি হিসেবেই দেখা হয়ে থাকে। কারণ এসব ঋণ সাধারণত সরকার ফেরত পায় না। যে কারণে পরে পুরো ঋণই অনুদান, ভর্তুকিতে রূপান্তরিত হয়। বেসরকারি খাত থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিদ্যুৎ পেতে পিডিবিকে ঋণ দেয় সরকার।

সূত্র জানিয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে নগদ ঋণ খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে এই ৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) জন্য কোনও বরাদ্দ রাখা হচ্ছে না।

চলতি অর্থবছরেও এ ২ খাতে কোনও বরাদ্দ রাখেনি সরকার। বরং অন্যান্য খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় গত কয়েক অর্থবছর ধরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) কোনও ভর্তুকি দেয়নি সরকার। আগামী অর্থবছরেও তাই ধারাবাহিকতার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

এছাড়া গ্রামে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসার, গ্রামের হাট বাজারগুলোকে অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউস হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে গ্রামবান্ধব করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতি গ্রামে ইন্টারনেট সেবা, স্যাটেলাইট টেলিভিশন, অনলাইন ব্যাংকিং ও ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করা হবে।

সরকার মনে করে কৃষি, খাদ্য, তৈরি পোশাক, পাট, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ খাতে এই সুবিধা দেওয়া গেলে সরকারের ওই উদ্যোগ সফল হবে। গ্রামের প্রান্তিক ভোটাররা এর সুবিধা পাবেন।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছেন, প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আসন্ন বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও ঋণখাতে বরাদ্দ বাড়লেও রাজস্ব আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কোনও ধরনের চাপ দেওয়া হবে না।

প্রত্যেক বিভাগকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজ উদ্যোগে আয় করতে হবে। সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হবে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের দিকে। এর মাধ্যমে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

বাজেটে প্রণোদনা ভর্তুকি ও ঋণখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে গ্রামীণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য। এজন্য থাকবে বিশেষ পদক্ষেপ। আগামী জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে (১৩ জুন) ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিবছর জুনের প্রথম সপ্তাহের প্রথম বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ঈদের ছুটির কারণে এ বছর বাজেট ঘোষণার দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে প্রাথমিকভাবে বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বা সাড়ে ১৩ শতাংশ বেশি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মতে, নির্বাচনি ইশতেহার অনুসারে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, ‘নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে সরকারকে তৎপর থাকতে হবে।

সেক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাজেটে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে বরাদ্দ দিতে হবে। যাতে প্রান্তিক মানুষগুলো এ সুবিধা পায়।’

জানা গেছে, পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। আসন্ন বাজেটে বিদেশি বিনিয়োগ বিশেষ করে পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ থাকছে।

এছাড়া আগামী পহেলা জুলাই থেকে দেশব্যাপী অটোমেশন পদ্ধতিতে (অনলাইন) সঞ্চয়পত্র বিক্রির কার্যক্রম শুরু হবে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে সঞ্চয় স্কিমের সুদ ও আসল সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে চলে যাবে। 

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রাথমিকভাবে বরাদ্দের প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে এ খাতে প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা চেয়ে প্রস্তাব পাওয়া গেছে।

এডিপি’র লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত চাহিদা রয়েছে ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা কোথা থেকে পাওয়া যাবে তা খতিয়ে দেখছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

চলতি সংশোধিত উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের তুলনায় আগামীতে প্রায় ২২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা বেশি খরচের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী নতুন সরকারকে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করতে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি চলতি বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বাড়াতে হবে। ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো হবে ১৬.৭ শতাংশ।

পরিবেশ ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ১১ শতাংশ, আমদানি খাতের প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশ ও রেমিটেন্স প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এছাড়া আগামী অর্থবছর শুরুর দিন অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে তিন স্তরে কার্যকর করা হবে নতুন ভ্যাট আইন। যা ৫, ৭ ও ১০ শতাংশ হারে হবে।

বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশের ভ্যাট ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। আয়কর ও করপোরেট কর কমানোর ঘোষণা আসতে পারে।

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments