চীনামাটি ও নীল জলের রাজ্য বিরিশিরি

চীনামাটি ও নীল জলের রাজ্য বিরিশিরি
চীনামাটি ও নীল জলের রাজ্য বিরিশিরি

সি নিউজ:চিনামাটি ও নীল জলের রাজ্য বিরিশিরি নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। বিরিশিরি অনেক আগে থেকে সুনাম অর্জন করেছে পর্যটকদের কাছে। ব্রিটিশ আমলে এখানে নির্মিত হয়েছিল কালচারাল একাডেমি।এখানে রয়েছে সোমেশ্বরী নদী, সাগর দিঘী, দুর্গাপুর রাজবাড়ি, মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য, পুরাকীর্তি নিদর্শন মঠগড় সহ আরো উল্লেখযোগ্য স্থান। এই স্থানগুলো সময়ের সাথে সাথে মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিরিশিরি মূলত দূর্গাপুর পৌরসভার একটি ওয়ার্ড যাকে সোমেশ্বরী নদী দুর্গাপুর থেকে পৃথক করেছে।

বিরিশিরির মূল আকর্ষণ হলো চীনামাটির পাহাড়। চীনামাটির পাহাড় বিরিশিরির বিজয়পুরে অবস্থিত। পাহাড়ের দৈর্ঘ্য ১৬ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৬০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে গেছে নীলচে সবুজ পানির হ্রদ। চীনামাটির পাহাড় বিরিশিরির প্রকৃতিকে অনন্য সৌন্দর্য দান করেছে। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে কিছু লালচে মাটিও দেখা যায় বিরিশিরিতে। নীলচে সবুজ জলের হ্রদের পানির মূল উৎস সোমেশ্বরী নদী। সোমেশ্বরী নদী কয়লা খনি হিসেবে অধিক পরিচিত।
বিরিশিরির স্থানীয় জনসংখ্যার অধিকাংশ জনসংখ্যা হলো গারো সম্প্রদায়ের। এছাড়াও অন্য সম্প্রদায়ের লোকজন রয়েছে। তবে সংখ্যায় কম। ১০০ ভাগের ৬০ ভাগ গারো আদিবাসী, ৩০ ভাগ মুসলিম, বাকি ১০ ভাগ হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায় বাস করে বিরিশিরিতে। বিরিশিরিতে দেখার মতো অনেক স্থান রয়েছে। 
চিনামাটির পাহাড়, নীলচে সবুজ জলের হ্রদ ছাড়াও বিরিশিরিতে রয়েছে বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি, কমলা রানীর দীঘি, সোমেশ্বরী নদী, কুল্লাগড়া মন্দির, রানীখাং গীর্জা। আসুন এক ঝলকে জেনে নিই কিছু দর্শনীয় স্থানের বিস্তারিত।

কালচারাল একাডেমি
বিরিশিরির কালচারাল একাডেমিতে আদিবাসী সংস্কৃতির চর্চা করা হয়। প্রতিবছর এখানে আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় এটি পরিচালিত হয়। এখানকার পরিবেশ খুব শান্ত ও স্নিগ্ধ। এই একাডেমিতে গেলে পাহাড়িদের সাংস্কৃতিক পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে দুটি লাইব্রেরিও রয়েছে। পাহাড়ি সংস্কৃতি সংক্রান্ত বইপত্র রয়েছে লাইব্রেরিতে।


কমলা রাণী দীঘি
কমলা রাণী দীঘিটি স্থানীয়দের কাছে সাগর দীঘি নামেও সুপরিচিত। বিরিশিরি ইউনিয়নের পাশেই এই দীঘিটির অবস্থান। দীঘিটি কালের পরিক্রমায় নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে প্রায়। তবুও পশ্চিম দিকে এই দীঘির কিছু অংশ কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে।
কুল্লাগড়া মন্দির
বিরিশিরির আরেকটি চমৎকার স্থান কুল্লাগড়া মন্দির। দূর্গাপুরের বিজয়পুর যাওয়ার পথে এই মন্দির দেখা যায়।

এছাড়াও বিরিশিরিতে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তৈরি সুড়ঙ্গের পিলার ও বাংলাদেশ ভারতের সীমান্ত।
গারো, হাজং ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা এখানে বসবাস করে বলে বিরিশিরিতে গেলে তাদের জীবনধারা, সংস্কৃতি দেখতে পাবেন। পাহাড়িদের ছুটে চলা, কাজ, বসবাস ইত্যাদি দেখতে পাবেন। তাছাড়া বিরিশিরিতে রয়েছে তেভাগা আন্দোলনের বেশ কিছু স্মৃতিস্তম্ভ ও সেন্ট যোসেফের গির্জা। পুরো পরিবেশ বেশ শান্ত ও নির্মল। শহরের যানযট নেই সেখানে, নেই কাজের ব্যস্ততা। পাহাড় দেখে কিংবা নদীর তীরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিলেও ক্লান্ত হবেন না আপনি।
সোমেশ্বরী নদীর তীরের কাশবনের অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে বাধ্য হবেন আপনি। কাশবনের সাদার ভিড়ে পাখির মতো ডানা মেলে দিতে পারবেন। শহরের ক্লান্তি ভুলে কাশবনের সৌন্দর্যে চোখ ও মনকে শীতল করতে পারবেন, প্রশান্তির ছোঁয়া দিতে পারবেন। তাছাড়া নদীর জল, দক্ষিণের বাতাস, সাদা মাটির পর্বত আপনাকে আনন্দ দেবে, সন্দেহ নেই।
সব ঋতুতে সোমেশ্বরী নদী সুন্দর হলেও বর্ষাকালে নদীতে যেন যৌবনের জোয়ার আসে। আর তখন নদী পানিতে ভরে ওঠে। চারদিকে থৈ থৈ পানি আর তার উচ্ছ্বলতা দেখতে ভিড় জমায় অসংখ্য পর্যটক। নদীতে নৌকা দিয়ে ঘুরতে আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেখে ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ইচ্ছে করবে আপনার।নেত্রকোনার বিরিশিরি আপনাকে ভাবাবে, হাসাবে ও আনন্দ দেবে।
কখনো নদীর সবুজ জল, কখনো লাল জল আবার কখনো নীল জল দেখে আপনি মুগ্ধ হবেন। কখনো চীনামাটির অথবা গোলাপি পাহাড়ের মুগ্ধতায় আপনি মৌনতা খুঁজে পাবেন। নদীতে ট্রলারে করে কিংবা নৌকায় চড়ে ঘুরে ঘুরে চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। পরিবার নিয়ে ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত স্থান বিরিশিরি।


বিরিশিরিতে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা
বিরিশিরিতে বেড়াতে গেলে যে রেস্ট হাউজে থাকবেন সেখানে খেতে পারবেন। দেশীয় সকল খাবার যেমন ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, সবজী দিয়ে খেতে পারবেন। এছাড়া বকের মাংসও পাওয়া যায়। ইচ্ছে করলে স্থানীয় হোটেলে খেতে পারেন। সকালের নাস্তায় পরোটা, ডিম, সবজি, চা দুপুরে ভাত, মাছ, সবজী সহ আরো আইটেম খেতে পারবেন। দুপুর ৩টার পর হোটেলগুলোর খাবার শেষ হয়ে যায়। তাই দুইটার মধ্যে দুপুরের খাবার খেয়ে নেয়া ভালো। দুর্গাপুর বাজারের বিখ্যাত বালিশ মিষ্টি খেয়ে দেখতে পারেন।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাসে, ট্রেনে করে বিরিশিরিতে যাওয়া যায়। নিজস্ব পরিবহন থাকলে কোনো ঝামেলা ছাড়াই চলে যাওয়া যায়। বাসে গেলে মহাখালী থেকে সরকার, জিন্নাত বাসে উঠে ২৫০-৩৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে দুর্গাপুর যেতে পারবেন। সময় লাগবে ৫-৬ ঘণ্টা। বাসগুলো বিরিশিরির উদ্দেশ্যে ছাড়লেও সুখনগরী পর্যন্ত যায়। সুখনগরীতে নেমে ছোট নদী পার হয়ে ওপারে গিয়ে বাস, রিকশা কিংবা টেম্পুতে করে দুর্গাপুর যাওয়া যাবে। বিরিশিরির দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার জন্য ৫০০-৬০০ টাকায় ব্যাটারিচালিত রিক্সা ভাড়া করা ভালো।
কোথায় থাকবেন
বিরিশিরিতে থাকার জন্য ডাক বাংলো, গেস্ট হাউজ, মধ্যম মানের আবাসিক হোটেল আছে। স্বর্ণা গেস্ট হাউজ, হোটেল সুসং, হোটেল গুলশান ও হোটেল জবাতে থাকা যাবে।