চিনির বিকল্প স্টেভিয়া


সি নিউজ ডেস্ক : স্টেভিয়া মিষ্টি গুল্ম জাতীয় ভেষজ গাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম (Stevia rebaudiana) ।এটি Compositae পরিবারভুক্ত গাছ। গাছটি কষ্টসহিষ্ণু বহুবর্ষজীবী এবং ৬০ থেকে ৭৫ সেমি. পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতা বর্ষাকৃতি, ফুল সাদা এবং বীজ ক্ষুদ্রাকৃতি। পাতাগুলো বিপরীত দিকে অবস্থিত, খাজকাটা, আঁশালো ও গাঢ় সবুজ। ফুলগুলো সাদা, নলাকৃতি এবং উভয়লিঙ্গ।

পৃথিবীতে ২৪০টির মতো প্রজাতি এবং ৯০টির মতো জাত আছে। গাছটির অনেক শাখা প্রশাখা গজায়। মোটামূল মাটির নিচের দিকে আর চিকন মূলগুলো মাটির ওপরে ছড়িয়ে পড়ে। গাছগুলো সুগন্ধ ছড়ায় না কিন্তু পাতাগুলি মিষ্টি।

স্টেভিয়ার পাতা চিনি অপেক্ষা ৩০-৪০ গুন এবং পাতার স্টেভিয়াসাইড চিনি অপেক্ষা ৩০০ গুন বেশি মিষ্টি। এটি স্বল্পদীর্ঘ দিবস উদ্ভিদ। স্টেভিয়ার গাছ সহজে উৎপাদন করা যায়। চিনির বিকল্প হিসাবে জিরো ক্যালরি স্টেভিয়ার পাতা ব্যবহার করা যায়।

স্টেভিয়ার ইতিহাস: স্টেভিয়ার আদি নিবাস প্যারাগুয়েতে। ১৯৬৪ সালে প্যারাগুয়েতে প্রথম স্টেভিয়ার বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু হয়। জাপানে চাষাবাদ শুরু হয় ১৯৬৮ সালে। তখন থেকে বিভিন্ন দেশে বিশেষত ব্রাজিল, কলম্বিয়া, পেরু, চীন, কোরিয়া, আমেরিকা, কানাডা, ইসরাইল, মেক্সিকো, থাইল্যান্ড, মালেশিয়াসহ প্রভৃতি দেশে এটি ফসল হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ শুরু হয়। ১৮৮৭ সালে সুইজারল্যান্ডের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ড. এম.এস বার্টনি স্টেভিয়াকে প্রথম বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দেন। খাদ্যদ্রব্য মিষ্টি করতে জাপানে ৪০ বছর ধরে স্টেভিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকাতেও দীর্ঘদিন ধরে স্টেভিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০১১ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) স্টেভিয়া ব্যবহারের ছাড়পত্র দিয়েছে।

প্যারাগুয়ের গুরানী ইন্ডিয়ান নামক উপজাতীয়রা একে বলে কা-হি-হি অর্থাৎ মধু গাছ। আফ্রিকাতে এটি মধু পাতা বা চিনি পাতা নামে পরিচিত। এছাড়াও থাইল্যান্ডে মিষ্টি ঘাস, জাপানে আমাহা সুটেবিয়া ও ভারতে মধু পারানি নামে স্টেভিয়াকে অভিহিত করা হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্র্যাক নার্সারি ‘ব্র্যাক ঔষধি-১১’ নামে স্টেভিয়ার টিস্যু কালচার চারা বাজারজাত করছে।

স্টেভিয়ার গুণাগুণ: স্টেভিয়াতে অ্যাসপার্টেম, সেকারিন, সুক্রলস বা কৃত্রিম মিষ্টি জাতীয় কোনো জিনিস নেই। স্টেভিয়ার মধ্যে কোনো কার্বোহাইড্রেট কিংবা ক্যালরি নেই, তাই এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য চিনির সবচেয়ে ভালো প্রাকৃতিক বিকল্প। এছাড়াও এরমধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস বিনষ্টকারী প্রাকৃতিক রাসায়নিক উপাদান।

স্টেভিয়ার উপকারিতা: ক্যালরিমুক্ত এই মিষ্টি ডায়াবেটিক রোগী সেবন করলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ পরিবর্তন হয় না, উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করে, যকৃত, অগ্ন্যাশয় ও প্লীহায় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে, স্টেভিওসাইড অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসরণে সহায়তা করে, ত্বকের ক্ষত নিরাময় ও দাঁতের ক্ষয় রোধ করে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দমন করে, খাদ্য হজমে সহায়তা করে, স্টেভিয়াতে কোনো ক্যালরি না থাকায় স্থূলতা রোধ করে, শরীরের ওজন কমাতে সহায়তা করে, মিষ্টি জাতীয় খাবারে চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। খাবারে গুণাগুণ বৃদ্ধি করে ও সুগন্ধ আনয়ন করে, শরীরের সুস্থতা ও সতেজতাবোধ সৃষ্টি করে।

এটি ব্যাকটেরিয়া সাইডাল এজেন্ট হিসেবে কাজ করে, স্কিন কেয়ার হিসেবে কাজ করে বিধায় ত্বকের কোমলতা এবং লাবণ্য বৃদ্ধি করে, স্বাদ বৃদ্ধিকারক হিসাবে কাজ করে। চা, কফি, মিষ্টি, দই, বেকড ফুড, আইসক্রিম, কোমল পানীয় ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এটি ঔষধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

স্টেভিয়ার ব্যবহার: স্টেভিয়ার সবুজ ও শুকনো পাতা সরাসরি চিবিয়ে কিংবা চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যায়। পাতা শুকিয়ে গুড়ো করে বোতলে সংরক্ষণ করা যায়। পাতার গুড়ো দিয়ে মিষ্টান্ন তৈরি করে ডায়াবেটিস রোগীরা খেতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত এ ঔষধী গাছের কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।

পাতা শুকানো: স্টেভিয়া পাতা সংগ্রহের পর সূর্যালোকে বা ড্রায়ারের মাধ্যমে পাতা শুকাতে হবে। পাতা শুকানোর জন্য কমপক্ষে ১২ ঘণ্টার সূর্যালোক প্রয়োজন হয়। পাতা শুকানোর পর ক্রাশ করে পাউডারে পরিণত করা হয়। এক্ষেত্রে কফি গ্রাইন্ডার কিংবা ব্লেন্ডার মেশিন ব্যবহার করা যেতে পারে। গরম পানিতে এক চতুর্থাংশ পাউডার মিশিয়ে ভালোভাবে ব্লেন্ড করে স্টেভিয়া সিরাপ তৈরি করা যায়। এ সিরাপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হয়।

টবে চাষ: বাসাবাড়িতে টবে বা পটে সহজেই স্টেভিয়া চাষ করা যায়। তবে গাছের টব রোদযুক্ত বারান্দায় বা ছাদে রাখতে হবে। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত স্টেভিয়ার ছোট চারা নিষ্কাশনযুক্ত দো-আঁশ মাটিতে অথবা দো-আঁশ ও জৈব সার মিশ্রিত ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি মাটির টবে সারাবছর রোপণ করা যায়। এ গাছের চারা রোপণের ২৫ থেকে ৩০ দিন পর পাতা সংগ্রহ করা যায়। গাছে ফুল আসার ২৫ থেকে ৩০ দিন পর থেকে ওপরের অংশ ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। পরে গাছের গোড়া থেকে একসঙ্গে অনেক চারা বের হতে থাকে এবং ২০ থেকে ২৫ দিন পর পুনরায় পাতা সংগ্রহ করা যায়।

বাংলাদেশে সম্ভাবনা: স্টেভিয়ার গাছের ছোট চারা ৫০ টাকা এবং বড়গুলো ১০০ টাকা করে বিক্রি হয়। এর পাউডার প্রায় ৪০০০ টাকা কেজি। স্টেভিয়া চাষ করে হেক্টরপ্রতি বছরে ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।

বিএসআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকতা ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রধান ড. কুয়াশা মাহমুদ বলেন, ২০০১ সালে ড. সামসুর রহমান বিদেশ থেকে স্টেভিয়ার চারা নিয়ে আসেন। তারপর বায়োটেকনোলজি বিভাগ এটা নিয়ে গবেষণা শুরু করে। আমরা গবেষণায় সফল হই, এবং ইতোমধ্যে বিএসআরআই স্টেভিয়া-১ নামে একটি প্রভাতি রেজিস্ট্রেশন করেছি। একটি গাছ থেকে ২-৩ মাস পর পাতা সংগ্রহ করা শুরু হয় এবং একই গাছ থেকে ৪-৫ বছর অনায়াসে ফলন পাওয়া সম্ভব। আমরা কৃষকদের মাঝে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি অনেকে আমাদের কাছ থেকে স্টেভিয়া সংগ্রহ করছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বল্প পরিসরে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য স্টেভিয়ার চাষ করা হচ্ছে। এটি ঔষধীগুণ সম্পন্ন একটি উদ্ভিদ যা চিনির চেয়ে অনেকগুন মিষ্টি। কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments