জাতীয়

ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস আজ


ড. আসাদুজ্জামান খান ॥ আজ ৭ জুন, ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে অনন্য ভাস্বর প্রতিবাদী চেতনার একটি দিন। ১৯৬৬ সালের এ দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ছয় দফা আন্দোলনের সূচনা হয়। আর ছয় দফার অনিবার্য পরিণতি ছিল স্বাধীনতা। ছয় দফা ঘুমন্ত বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিল এক ঝটকায়। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান গোষ্ঠী স্বার্থে বল প্রয়োগের নীতি অবলম্বন করে রাজনীতিকদের ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করে। এর ফলে বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ কারারুদ্ধ হন। ১৯৬৪ সালে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়ে নব উদ্যোগে বাঙালিকে সচেতন করার জন্য এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা বেগবান করার সময়োচিত ভূমিকা নেন। ১৯৬৬ সালে তিনি ছয় দফা আন্দোলনের কর্মসূচি দেন। তাসখন্দ চুক্তিকে কেন্দ্র করে পাঁচ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা উত্থাপন করেন। কিন্তু পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী তার এ দাবির প্রতি গুরুত্ব না দেয়ায় তিনি সম্মেলনে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকেন। আইয়ুব খান ছয় দফাকে অস্ত্রের ভাষায় মোকাবেলার ঘোষণা দিলে বঙ্গবন্ধু ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি তার দাবির প্রতি অটল ও অবিচল থেকে জনমত সংগ্রহে নেমে পড়েন। ১৯৬৬ সালের ১৩ মে আওয়ামী লীগ আয়োজিত পল্টনের জনসভায় ছয় দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হরতাল কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। মাসব্যাপী ছয় দফা প্রচারে ব্যাপক কর্মসূচি নেয়া হলে স্বৈরশাসক আইযুব খান অর্ধডজনের বেশি মামলা দায়ের করে বঙ্গবন্ধুকে হয়রানি করা শুরু করে। ১৯৬৬ সালের এপ্রিলে বঙ্গবন্ধু খুলনায় একটি জনসভা করে যশোর হয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন। তখন পুলিশ যশোরে তার পথরোধ করে এবং আপত্তিকর বক্তৃতা প্রদানের অভিযোগে ঢাকা থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা বলে তাকে গ্রেফতার করে। যশোরের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বঙ্গবন্ধুকে হাজির করা হলে তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেয়া হয়। ঢাকায় ফিরে সদর দক্ষিণ মহকুমা প্রশাসকের সামনে হাজির হলে তিনি তার জামিনে অসম্মত হন কিন্তু দায়রা জজ প্রদত্ত জামিন বলে বঙ্গবন্ধু সেদিনই মুক্তি পান এবং সন্ধ্যায় নিজের বাসায় যান। কিন্তু এক ঘণ্টার মধ্যেই রাত আটটায় পুলিশ আবার ‘আপত্তিকর’ বলে কথিত এক বক্তৃতার ওপর সিলেট থেকে প্রদত্ত ও প্রেরিত এক গ্রেফতারি পরোয়ানা বলে বঙ্গবন্ধুকে তার বাসা থেকে গ্রেফতার করে তাকে সিলেটে নিয়ে যায়। পরদিন বঙ্গবন্ধুকে আদালতে হাজির করা হলে সিলেটের ম্যাজিস্ট্রেট তার জামিনের আবেদন বাতিল করে কারাগারে প্রেরণ করেন। পরদিন সিলেটের দায়রা জজ তাকে জামিন প্রদান করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু মুক্ত হওয়ার আগেই পুলিশ আবার আপত্তিকর বলে কথিত এক বক্তৃতা দেয়ার অভিযোগে তাকে জেলখানার দরজায় গ্রেফতার করে ময়মনসিংহ থেকে প্রেরিত এক গ্রেফতারি পরোয়ানা বলে। সেই রাতেই পুলিশ প্রহরাধীনে বঙ্গবন্ধুকে ময়মনসিংহ নিয়ে যাওয়া হয় এবং একইভাবে ম্যাজিস্ট্রেট জামিন প্রদানে অস্বীকৃত হলে দায়রা জজ প্রদত্ত জামিনে মুক্তিলাভ করে বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে আসেন। এসব হয়রানি ১৯৬৬ সালের এপ্রিলে ঘটে। কিন্তু এক মাসে এতো হয়রানি করার পরও বঙ্গবন্ধুকে দমিয়ে রাখা গেল না। পরের মাসেই মে মাসের প্রথম সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জের এক জনসভায় বক্তৃতা দিয়ে ঢাকায় ফিরতেই রাত একটায় ‘পুলিশ ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুল’ এর ধারায় তাকে গ্রেফতার করে। সেইসঙ্গে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার, জেল, জুলুম ও নির্যাতনের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালের ৭ জুন হরতাল ডাকে। সারাদেশব্যাপী হরতালের দিন মনুমিয়াসহ ১১ জন পুলিশের গুলিতে নিহত হন। পুলিশ প্রায় আটশ’ লোককে গ্রেফতার করে। আটকাবস্থায় কারাকক্ষেই বঙ্গবন্ধুকে বেশ কয়েকবার বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। প্রায় এগার মাস আটক রাখার পর ১৯৬৮ সালের ১৭ জুন বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়া হয় কিন্তু ১৭ জুন রাতে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা কারাগারের গেট থেকে জোর করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রুদ্ধ কক্ষে আটকে রাখা হয়। এ সময় বঙ্গবন্ধুকে বহির্জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। নির্জন কক্ষে একা, কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হতো না। এমনকি খবরের কাগজ পর্যন্ত পড়তে দেয়া হতো না। এভাবে তাকে পাঁচ মাস আটকে রাখা হয়।
১৯৬৬ সালের এইদিনে লাখো বাঙালি রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলনের প্রচ-তায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদের জোয়ারে ভয় পেয়ে যায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। এদিন সন্ধ্যায় জারি করা হয় কারফিউ। হাজার হাজার আন্দোলনকারী বাঙালিকে গ্রেফতার করা হয়। এমনি ভাবে ছয় দফা ভিত্তিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বাংলার সর্বত্র। শহীদের রক্তে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। এদিন বাংলার সচেতন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয় এদেশের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের সংগ্রাম। আর ছয় দফার অনিবার্য পরিণতি বাংলার স্বাধীকার আন্দোলন। ছয় দফার ধারাবাহিকতায় আসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা,  ১১ দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরিশেষে বিশ^ মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

 

Admin

0 Comments

Please login to start comments