আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক ফিলিস্তিনি সংহতি দিবস আজ


ড. আসাদুজ্জামান খান : ২৯ নভেম্বর ১৯৭৮ সাল থেকে প্যালেস্টাইনের জনগণের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এই তারিখটিকে ফিলিস্তিনি জনগণের অর্থ ও গুরুত্বের কারণে নির্বাচিত করা হয়েছিল, এটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আহ্বানে প্যালেস্টাইনের বিধানের বার্ষিক উদযাপন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দিবসটি উপলক্ষে প্রদত্ত বাণীতে বলেছেন - ‘স্বনির্ভরতা, স্বাধীনতা এবং মর্যাদার জীবনধারার জন্য দীর্ঘ দশক ধরে ফিলিস্তিনি সংগ্রামের মধ্যে অনেক বাধা রয়েছে। ফিলিস্তিনি অঞ্চলে অব্যাহত সামরিক দখল, চলমান সহিংসতা এবং উদ্দীপনা অব্যাহত থাকা এবং সম্প্রসারণ শান্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কে গভীর অনিশ্চয়তা বিশেষত গাজায় মানবিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটছে।’ ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২৯ নভেম্বরকে আন্তর্জাতিক দিবস ঘোষণা করে সেইদিনটিকে যেদিন ১৯৪৭ সালে সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিনের বিভক্তির বিষয়ে সিদ্বান্ত গ্রহণ করেছিল। আন্তর্জাতিক দিবসটি ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ কওে যে ফিলিস্তিনের প্রশ্নটি অমীমাংসিত না থাকা এবং ফিলিস্তিনি জনগণ এখনো সাধারণ পরিষদের দ্বারা নির্ধারিত তাদের অসামান্য অধিকার অর্জন করতে পারে না, যেমন অধিকার বহিরাগত হস্তক্ষেপ ছাড়া স্ব-দৃঢ়সংকল্প, জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অধিকার এবং তাদের বাড়ি ও সম্পত্তিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার, যা থেকে তারা বিতাড়িত হয়েছে।
৩১ বছর ধরে (১৯৮৬ সাল থেকে) ইউনেস্কো শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান এবং অভিব্যক্তি স্বাধীনতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণের সাথে একাত্মতার আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপন করছে। এই লক্ষ্যগুলো সংলাপ ও বিনিময়কে উৎসাহিত করার জন্য ইউনেস্কোর সমস্ত কর্মকে স্বীকৃতি দেয়, সমস্ত নারী ও পুরুষের মনকে শান্তি বজায় রাখার জন্য এবং সাদৃশ্য ও নিরাপত্তা একসাথে বসবাসের ভিত্তি পুনঃস্থাপন করার জন্য বর্ণবাদ ও ঘৃণার সব রূপকে প্রতিহত করুন। মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদী- এ তিন ধর্মের অনুসারীদের কাছেই ফিলিস্তিন পুণ্যভূমি হিসেবে গণ্য। ফলে এর কর্তৃত্ব নিয়ে শুরু থেকেই নানারকম দ্বন্দ্ব ও সংঘাত চলে আসছে। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে ইহুদী ও খ্রিস্টানদের মধ্যে এ নিয়ে অনেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। প্রাচীন যুগের রীতি অনুযায়ী ক্ষমতার লড়াইয়ে যারা বিজয়ী হয়েছে তারাই এর কর্তৃত্ব করেছে। কিন্তু বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিপত্তি বাধে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সারাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যাযাবর জাতি ইহুদীদের একটি স্থানে জড়ো করার দাবি উঠে। পাশ্চাত্যের পরাশক্তিগুলো এ ব্যাপাওে জোরালো তৎপরতা চালায়। মুসলমানদেরকে নিগৃহীত করার হীন উদ্দেশে মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদীদের পুনর্বাসন করার জঘন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সে লক্ষ্যে তারা নিজেদের প্রত্যক্ষ মদদে মধ্যপ্রাচ্যের পূণ্যভূমি ফিলিস্তিনে ইহুদীদের এনে জড়ো করে। একটি স্বাধীন ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জাতিসংঘও এতে সহযোগিতা জোগায়। তখন বলা হয়েছিল এখানে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রও গঠন করা হবে। জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ইহুদী ও  ফিলিস্তিন এ দুটি দেশে বিভক্ত এবং এর ৫৪% স্থান ফিলিস্তিন থেকে পৃথক করা হয়। তাই এই দিনটি ফিলিস্তিনের প্রতি বিশ্ব সংহতি দিবস হিসেবে পালন করা হয়। কিন্তু এরপর থেকে ফিলিস্তিনের সমস্যা দিন দিন ঘনীভূত হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের অধিকারের ওপর পাশ্চাত্যের আধিপত্যের কারণে ফিলিস্তিন একটি নরককুন্ডে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই অকারণে নিষ্পাপ ফিলিস্তিনি জনগণের রক্ত ঝরছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর বুলেটের আঘাতে অসংখ্য মুসলিমের বুক ঝাঁঝরা হচ্ছে। তাদের ঘর-বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইসরাইলি বাহিনীর পরিকল্পিত হামলায় মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি প্রায়শই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।  ফিলিস্তিনিদের রক্তে তাদের মাতৃভূমি রঞ্জিত হচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে অসহায় নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধ লোক। নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর আক্রমণ করার পরও ইসরাইল থামছে না। বাধ্য হয়ে মুসলিম যুবকেরা অস্ত্র হাতে নিয়ে প্রতিরোধ   সংগ্রামে যোগ দিচ্ছে। এমনকি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতেও তারা পিছপা হচ্ছে না। সুদীর্ঘ প্রায় ৬৮ বছরের বেশি হলো মুসলমানদের পবিত্র মসজিদ আল-আকসা ইহুদীরা জবরদখল করে আছে। অসহায় ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জনগণ দীর্ঘদিন ধরে তাদের আবাসভূমি ও আল-কুদ্স তথা বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের জন্য রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এমনিভাবে মুসলমানদের প্রথম কিবলা ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিরাজের স্মৃতিসহ বহু নবীর পুণ্যভূমি বিজড়িত বায়তুল মুকাদ্দাস সুদীর্ঘ ৬৬ বছর ধরে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর সহায়তায় ইহুদীদের জবর দখলে রয়েছে।  ফিলিস্তিন সারা দুনিয়ায় নিপীড়িত ও নির্যাতিত জনগণের প্রতীক হয়ে উঠেছে এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই সংগ্রামের আন্তর্জাতিক ভারকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যদিও ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি মানুষের সমর্থন, সহমর্মিতা এবং সহানুভূতি দিন দিন বাড়ছে।
 

Admin

0 Comments

Please login to start comments