জাতীয়

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সফল অভিযানে হাইজ্যাকমুক্ত বিমান


সি নিউজ : চট্টগ্রাম বিমানন্দরে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটেছে। যে ব্যক্তি উড়োজাহাজটি জিম্মি করেছিলেন, কমান্ডো অভিযানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে আটক করা হয়েছে। রোববার সন্ধ্যায় ২ ঘণ্টার নাটকীয়তার পর ওই ব্যক্তিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটকের খবর নিশ্চিত করেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রহমান। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা যায়, গুলিবিদ্ধ বিমান ছিনতাইকারী মারা গেছেন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ত্বরিৎ পদক্ষেপে সাম্প্রতিক ইতিহাসের সন্ত্রাসী এই ঘটনার সমাপ্তি হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে। বিজি-৭৩৭৮০০ ফ্লাইটটি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাই যাওয়ার কথা ছিল। ফ্লাইটে যাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৪৭ জন। উড়োজাহাজের ভেতরে একজন যাত্রীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। তিনি বিদেশি কেউ একজন বলে এক যাত্রীর বরাতে জানিয়েছে দায়িত্বশীল সূত্র। আরো জানা গেছে, ভেতরে একটি গুলির শব্দ শোনা গেছে। কেউ একজন তাতে আহত হতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে। সূত্রটি জানায়, প্রথমে কেবিন ক্রুদের একজন ওই বিদেশি ব্যক্তিকে দেখে সন্দেহ করলে পাইলটকে জানান। পাইলট কোনো ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপত্তার স্বার্থে অবতরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। ফ্লাইটে ক্যাপ্টেন ও বেশিরভাগ যাত্রী নিরাপদে নেমে যেতে পারলেও একাধিক কেবিন ক্রু জিম্মি রয়েছেন বলে জানায় সূত্রটি। একজন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বিমানের ভেতরেই রয়েছেন। অস্ত্রধারী নিজেও ভেতরে অবস্থান করছেন। এদিকে রানওয়েতে বিমানটিকে ঘিরে রাখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। র‌্যাব, পুলিশ, এপিবিএন সসদ্যরা রয়েছেন সেখানে। বাইরে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও এ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মুহিবুল হক জানান, দু’জন কেবিন ক্রু ভেতরে রয়েছেন। কেউ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে আমরা এখনো খবর পাইনি। এদিকে, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ওই ফ্লাইটের জরুরি অবতরণের সময় শাহ আমানত বিমানবন্দরে ছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য মঈনুদ্দিন খান বাদল। রিজেন্ট এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটের যাত্রী ছিলেন তিনি। ঘটনাস্থল থেকে একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘সন্দেহভাজন ব্যক্তিটি অস্ত্রধারী। সে পাইলটকে অস্ত্রের মুখে উড়োজাহাজটি ছিনতাই করার চেষ্টা করে।’ বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে ১৪৭ যাত্রী নিয়ে বিমানটি ছেড়ে যায়। এর মধ্যে ৮৬ জন ছিলেন দুবাইগামী যাত্রী। বাকি ৬১ জন অভ্যন্তরীণ যাত্রী, যাদের চট্টগ্রামে নামার কথা ছিল। আর চট্টগ্রাম থেকে দুবাইগামী বাকি যাত্রীদের ওঠার কথা ছিল। বিমানটির যাত্রী বহনের ক্ষমতা প্রায় আড়াই শ’ জন। বাংলাদেশ বিমানের নতুন উড়োজাহাজ ময়ূরপঙ্খী ১৪২ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকা থেকে দুবাইয়ে রওনা দেয়। রোববার বিকেল সাড়ে চারটায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে যায়। আকাশে ওড়ার পরপরই উড়োজাহাজটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা হয়। পুরো কাজটি করেন অস্ত্রধারী এক ব্যক্তি। বিমানটিতে থাকা একাধিক ক্রু ও যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। একজন ক্রু জানান, বিকেল সাড়ে চারটায় কিছু সময় পর ময়ূরপঙ্খী আকাশে প্রায় ১৫ হাজার ফুট ওপরে দিকে উড়ে যাচ্ছিল। তখন উড়োজাহাজের ভেতরে যাত্রীদের আসনে থাকা এক ব্যক্তি উঠে ককপিটের দিকে আসেন। এ সময় ওই ব্যক্তি এক ক্রুর কাছে যান। কাছে গিয়ে তিনি ওই ক্রুকে ধাক্কা দেন এবং সঙ্গে সঙ্গে একটি পিস্তল ও বোমাসদৃশ একটি বস্তু বের করে বলেন, ‘আমি বিমানটি ছিনতাই করব। আমার কাছে পিস্তল ও বোমা আছে। ককপিট না খুললে আমি বিমান উড়িয়ে দেব।’ এর মধ্যে অন্য কেবিন ক্রুরা ককপিটে থাকা পাইলট ও সহকারী পাইলটকে গোপনে সাংকেতিক বার্তা দেন যে, উড়োজাহাজে অস্ত্রধারী আছে, উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টা হচ্ছে। ঠিক এ সময় উড়োজাহাজটি চট্টগ্রাম ও ঢাকার মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান করছিল। ওই ক্রু বলেন, উড়োজাহাজটি আকাশের ১৫ হাজার ফুটের কিছু ওপরে উড্ডয়ন করছিল। এর মধ্যে পাইলট মোঃ শফি ও সহকারী পাইলট মোঃ. জাহাঙ্গীর চট্টগ্রামগামী উড়োজাহাজটির ককপিটের দরজা বন্ধ করে দেন এবং কৌশলে জরুরি অবতরণের জন্য চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে বার্তা পাঠান। উড়োজাহাজে থাকা একটি সূত্র জানিয়েছে, ককপিটের দরজা না খোলায় অস্ত্রধারী ব্যক্তিটি চিৎকার করছিলেন। একপর্যায়ে ওই অস্ত্রধারী উড়োজাহাজের ভেতরে ‘বিস্ফোরণের’ মতো ঘটান। ততক্ষণে উড়োজাহাজটি চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণ করে। তবে ওই অস্ত্রধারী ফ্লাইট স্টুয়ার্ট সাগরকে আটকে রেখেছে। উড়োজাহাজ অবতরণের পর কৌশলে উড়োজাহাজের ডানার পাশের চারটি ইমারজেন্সি গেট দিয়ে যাত্রীরা নেমে পড়েন। উড়োজাহাজে থাকা এক যাত্রী জানিয়েছেন, তিনি নেমে আসা পর্যন্ত ক্রু সাগর ছাড়া ককপিটের ভেতরে তখন পর্যন্ত দুজন বৈমানিক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে কমান্ডো সোয়াত টিম রানওয়েতে পৌঁছে সেই ‘সন্দেহভাজন’কে আটক করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ বিমানের একটি সূত্র জানিয়েছে, ১৬২ আসনের ময়ূরপঙ্খী উড়োজাহাজে ইকোনমি ক্লাসে ১৩৩ জন ও বিজনেস ক্লাসে নয়জন যাত্রী ছিলেন। এ ছাড়া পাঁচজন ক্রু, এর মধ্যে দুজন নারী ছিলেন। ককপিটে দুজন পাইলট ছিলেন। উড়োজাহাজটির মডেল বোয়িং ৭৩৭-৮০০। উড়োজাহাজটি ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিমানের বহরে যুক্ত করা হয়। বেসামরিক বিমান পরিচালনা কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শাহ আমানতে সাংবাদিকদের কাছে বিমানটি জিম্মিদশা মুক্ত হওয়ার খবর দেন। তিনি বলেন, এই ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় আইএসপিআর জানিয়েছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্স চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ভিন্ন একটি সূত্রে জানা যায়, বিমান ছিনতাই চেষ্টাকারী চিত্রনায়িকা শিমলার ব্যর্থ প্রেমিক। তার নাম সাগর। প্রেমে ব্যর্থ হয়েই নাকি সে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। অন্য একটি সূত্র জানায়, ‘সন্দেভাজন’ ওই যাত্রীর আবদার ছিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দিলে তিনি ধরা দেবেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা বলেন, কোনোভাবেই বিষয়টিকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। রাতে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় আইএসপিআর জানিয়েছে, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্স চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’ এর আগে সন্ধ্যায় দুবাইগামী বাংলাদেশ বিমানের ময়ুরপঙ্খীর ফ্লাইটটি (বিজি-১৪৭) শাহ আমানত বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। বিমানের ভেতরে ক্রুদের অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত জিম্মি করে রেখেছে— এমন অভিযোগে পুরো বিমানবন্দর ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জানা গেছে, বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দিকে যাত্রা করে ফ্লাইটটি। সেখান থেকে বিমানটির দুবাই যাওয়ার কথা ছিল। চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর বিমানটি থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়া হয়।

সিনিউজ ডেস্ক

0 Comments

Please login to start comments