দেশজুড়ে

অবশেষে উদ্ধার হলো শিশু সুরাইত


রাজধানীর বাংলামোটরে এক সন্তানের মরদেহসহ অন্য সন্তানের গলায় দা ধরে বাসার ভেতরে বসে থাকা বাবাসহ ছেলেদেরকে উদ্ধার করা হয়েছে।বুধবার (৫ নভেম্বর) সকাল ৮টা থেকে বাংলামোটরের লিংক রোডের খোদেজা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উল্টো দিকের ১৬ নম্বর বাড়িতে এক সন্তানের মরদেহসহ অন্য সন্তানের গলায় দা ধরে বসে আছেন বাবা, এমন খবরে ওই বাড়ির সামনে অবস্থান নেয় থানা পুলিশ, র‌্যাব ও ফায়ার সার্ভিস।

পরে দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে ছয় ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা শেষে বেরিয়ে আসেন বাবা নুরুজ্জামান কাজল ও বড় ছেলে সুরাইত (সাড়ে তিন বছর)। কাফনে মোড়ানো ছোট ছেলে সাফায়েতের (আড়াই বছর) মরদেহও বের করে নিয়ে আসা হয়।এর আগে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনের বিভিন্ন বাহিনী উদ্ধার করতে আসে তাদেরকে। এসময় আশপাশের বহুতল ভবন থেকেও কৌতূহলী মানুষ অপেক্ষায় ছিল, কখন উদ্ধার হবে শিশু। এরই মধ্যে কাজ করে যাচ্ছিলেন পুলিশ, ‌‌্যাব ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। পুলিশ, র‌্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, তাঁরা চান কোনো রক্তপাত ছাড়াই যেন ঘটনার সমাপ্তি ঘটে।বাসা থেকে বের হওয়ার মুহূর্তেই বাবা নুরুজ্জামানকে আটক করে পুলিশ। সাফায়েতের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। আর সুরাইতকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার।তিনি বলেন, সকালে আমরা শিশু মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়ার পর থেকে কাজ শুরু করি। খবর পাই ঘরের ভেতরে শিশুর লাশ আছে, আরেক শিশু বাবার সঙ্গে আছে। ঘটনাস্থলে আসার পর দরজার ফাঁক দিয়ে দেখে এর সত্যতার বিষয়ে নিশ্চিত হই। দেখা যায়, ভেতরে টুপি ও পাঞ্জাবি পরা ব্যক্তিও আছেন। শুরুতে আমরা আসার খবর পেয়ে শিশুদের বাবা নুরুজ্জামান কাজল ক্ষিপ্ত হন। আমাদের চলে যেতে বলেন। না হলে অপর শিশুকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। সেসময় তাঁর হাতে একটি রামদা ছিল। পরে আমরা কৌশল বেছে নিই।মারুফ বলেন, ভেতরে থাকা সবার নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিই আমরা, ধৈর্য ধরি। হুট করে কিছু করতে যাইনি আমরা। রক্তপাত ছাড়াই কীভাবে কাজ করা যায়, সেভাবে কৌশল করি। নুরুজ্জামান কাজলকে আমরা শান্তভাবে বলি, বাইরে আপনাদের জন্্য মানুষ অপেক্ষা করছে। শিশুটির জানাজার জন্য মসজিদে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। শিশুটির জানাজার কথা বলাতে নুরুজ্জামান কিছুটা শান্ত হন। একপর্যায় দরজা খুলে তিনি বের হন। আগে থেকেই দরজার আশপাশে কিছু পুলিশ সদস্যকে লুকিয়ে রেখেছিলাম। কাজল দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আটক করে ফেলি। উদ্ধার করি জীবিত শিশু এবং অপর শিশুর লাশ।

তিনি বলেন, শিশুটিকে কিভাবে খুন করা হল তা ময়নাতদন্তের আগে বলতে পারছি না। বাসার ভেতরে আমরা ঢুকে দেখি, পুরো বাসাটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। নুরুজ্জামানকে দেখেও স্বাভাবিক মনে হয়নি। কোনও রক্তের দাগও প্রাথমিকভাবে পাওয়া যায়নি। এখানে একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, যে শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে তার বাবাকে আটক করা হয়েছে। ভিকটিম ও আটককৃতদের ব্যক্তির বাবা-ছেলে সম্পর্ক। নিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আমরা কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। আমরা পুরো বিষয়টা মানবিকভাবে প্রমাণ সাপেক্ষে দেখতে চাই।

ফায়ার সার্ভিসের হেডকোয়ার্টারের ইন্সপেক্টর আবদুর সহিদ  বললেন, আমরা কৌশলী হওয়ার কারণে সবকিছু ঠিকভাবে করা গেছে। বাড়িটিতে আসার পর আমরা দরজার ফাঁক দিয়ে নুরুজ্জামান কাজলের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করার পর তিনি খেপে যান। আমাদের চলে যেতে বলেন। পরে ভেতরে আলেম সাহেবের সহায়তায় কাজলক বলা হয়, ছেলের জানাজা পড়াতে হবে। মানুষ অপেক্ষা করছে। এতেই মন গলে যায় কাজলের। একপর্যায়ে দরজা খুলে দিলে সবাইকে উদ্ধার করা হয়।র‍্যাব-২-এর এসআই শহীদুল ইসলাম বলছিলেন, আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, শিশুটির বাবা বসে আছেন, তাঁর পাশে একজন হুজুর বসে আছেন। শিশুটিকে কাফনের কাপড়ে মোড়ানো একটি টেবিলের ওপর রাখা হয়েছে। শিশুটির বাবাকে কোনো সাহায্য লাগবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনাদের কারও সাহায্য লাগবে না। আপনারা কেন এসেছেন? আপনারা চলে যান। বেলা একটার দিকে আমি নিজে আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে আমার ছেলেকে দাফন করব।শহীদুল বলেন, এই কণ্ঠ শুনে মনে হয়েছে, হুট করে কিছু করা যাবে না। পরে কৌশলে জানাজার কথা বললে তিনি বেরিয়ে আসেন।

নুরুজ্জামান কাজলের স্বজনরা জানান, পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে নুরুজ্জামান কাজল তৃতীয়। বাবা মনু মিয়া। এই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা তারা। বাবা মারা গেছেন আগেই। নুরুজ্জামান নিজে টাইলসের ব্যবসা করলে চার বছর আগে লস করায় বন্ধ হয়ে যায়। পারিবারিক কলহ ও বাজে ব্যবহার করে পরিবারের অন্য সদস্যদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। গত তিন মাস আগে স্ত্রীকে নির্যাতন করে তাড়িয়ে দেয় নুরুজ্জামান। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল।

Admin

0 Comments

Please login to start comments